শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেল আলোচনা, ফের শুরু যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২২ আগস্ট, ২০২৬, 11:45 AM
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২২ আগস্ট, ২০২৬, 11:45 AM
শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেল আলোচনা, ফের শুরু যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ
শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক। শুক্রবার রাতে নির্ধারিত সময়সীমার আগে দুই দেশের আলোচনায় সমঝোতা না হওয়ায় কানাডার পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর জবাবে ওয়াশিংটনের আরোপ করা শুল্কের সমপরিমাণ শুল্ক নিজেদের পক্ষ থেকেও আরোপের ঘোষণা দিয়েছে অটোয়া।
শুক্রবার মধ্যরাতের সময়সীমার আগে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও আশাবাদের সুর ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, দুই দেশ নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং কানাডার আলোচনাকারী প্রতিনিধিদের দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।
কার্নি বলেন, “আমাদের শ্রমিক ও ব্যবসাগুলোকে সুরক্ষা দিতে কানাডা ওই শুল্কের সমপরিমাণ শুল্ক ডলারের বিনিময়ে ডলারে আরোপ করবে।”
তিনি আরও জানান, কানাডার শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে সরকার অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেবে। গত ১৮ মাসে এ খাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কার্নির ভাষ্য, কানাডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন ‘ত্বরান্বিত হচ্ছে’ এবং কোনও দেশকে কানাডার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেওয়া হবে না।
শেষ মুহূর্তে কেন ভেস্তে গেল আলোচনা
শুক্রবার রাত পর্যন্ত দুই দেশের কর্মকর্তারা চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা তিন দিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যায়।
সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা কানাডার সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছি।” তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পরই সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ফোনালাপে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে মার্কিন বাজারে রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কানাডার নতুন কিছু দাবি এবং আগের কয়েকটি প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে গত কয়েক দিনে তৈরি হওয়া সমঝোতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এরপরই আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়।
আপাতত ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক
নতুন করে কার্যকর হওয়া শুল্কের আওতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর আওতায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্য রয়েছে। গত বছর কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা মোট পণ্যের মূল্যের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এই শুল্কের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর তাৎক্ষণিক বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এর চেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- নতুন শুল্কের পাল্টা জবাব হিসেবে কানাডা একই হারে শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এমনিতেই জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মার্কিন ভোক্তারা বাড়তি ব্যয়ের চাপে রয়েছেন। এর মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা, ব্যবসায়িক ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
আলোচনার টেবিলে ছিল কী
আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে আমদানি করা ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছিল।
বর্তমানে কানাডীয় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। আলোচনার সময় এই হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
অন্যদিকে কানাডীয় গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। তবে পুরো গাড়ির মূল্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হয় না। গাড়িতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি যন্ত্রাংশের মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অংশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়। আলোচনায় এই শুল্কের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টিও উঠে এসেছিল। তবে এসব বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
কানাডার দুগ্ধবাজার নিয়েও ট্রাম্পের ক্ষোভ
কানাডার দুগ্ধবাজারে মার্কিন কৃষকদের প্রবেশাধিকার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন ট্রাম্প।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধজাত পণ্যকে নিজেদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিলেও নির্দিষ্ট কোটা বা পরিমাণসীমা নির্ধারণ করে রেখেছে। ওই সীমার বেশি পণ্য আমদানি করতে গেলে অত্যন্ত উচ্চহারে শুল্ক দিতে হয়। ফলে কার্যত অতিরিক্ত মার্কিন দুগ্ধপণ্য কানাডার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় না।
ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে সম্ভাব্য চুক্তির কথা বলতে গিয়ে বিশেষভাবে মার্কিন কৃষকদের সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “আমাদের কৃষকদের আর আটকে রাখা হবে না, কারণ কানাডার কারণে তারা খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।”
পুরোনো শুল্ক বিরোধও নতুন উত্তেজনার কারণ
কানাডার সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য বিরোধ নতুন নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কানাডীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে অটোয়া পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছিল।
ওই সময় কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের সরকারি নিয়ন্ত্রিত মদের দোকানগুলোতে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপও ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে।
তবে আগের মার্কিন শুল্কের সব কানাডীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে বিদ্যমান ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তির নিয়ম মেনে চলা পণ্যগুলো ওই শুল্কের আওতার বাইরে ছিল।
সামনে আরও পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা?
শুক্রবারের ব্যর্থ আলোচনা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। আপাতত নতুন মার্কিন শুল্কের আওতা সীমিত হলেও কানাডা পাল্টা সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
কার্নি অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, তার সরকার কানাডার শ্রমিক ও ব্যবসাগুলোকে সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কানাডা কোনও দেশের চাপের কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেবে না।
ফলে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দিন ধরে তৈরি হওয়া সমঝোতার সম্ভাবনা আপাতত ভেস্তে গেছে। আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে নতুন করে আলোচনায় বসতে হলে উভয় পক্ষকেই নিজেদের অবস্থান কিছুটা নমনীয় করতে হবে। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ দুই বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে ফের পূর্ণমাত্রার বাণিজ্য সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সূত্র: সিএনএন, আল-জাজিরা