“জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি পিছিয়ে কেন
১৬ এপ্রিল, ২০২৩, 2:54 PM
NL24 News
১৬ এপ্রিল, ২০২৩, 2:54 PM
“জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি পিছিয়ে কেন
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
পৌরসভা নির্বাচনের পর দেশে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ গনতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিমাপক। এ দেশে ব্রিটিশরা প্রথম নির্বাচনের আইন করে ১৮৮২ সালে। তা ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য। সরকার পরিচালনায় ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ওঠে ১৮৮৫তে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলনে। ১৮৯২ সালে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট’ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আইনসভায় ভারতীয়দের নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। নির্বাচন বলতে পরোক্ষ নির্বাচনকেই বোঝানো হতো। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট মহা রেকর্ড সৃষ্টি করে টানা তিন মেয়াদের জন্য সরকার গঠন করেছে। অপরদিকে দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ‘অপ্রত্যাশিত’ ভূমিধস পরাজয়ের পর অস্তিত্ব সংকটের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্থানীয় নির্বাচন গুলোতেও তারা তখন থেকেই পিছিয়ে ছিল এবং গনতন্ত্রের শিকড় প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সেই ব্যর্থতার গ্লানি এই নির্বাচনকে সামনে রেখেও তাদেরকে পিছিয়ে রেখেছে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরাশক্তি সমর্থনকারী দল বিএনপি সর্বদাই মিথ্যা, ছলনা ও অরাজকতার আশ্রয় নিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিদের সমর্থন তা বেশ ভালোভাবে প্রতিফলিত করে তুলেছে। বিদ্বেষ তৈরী ও দেশের মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরীতে তারা তৎপর।
গণতন্ত্রকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিল তারা। ৫০০ ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দিয়েছিল, সেখানে রক্ষিত শিশু-কিশোরদের বই পুড়িয়ে দিয়েছিল। কয়েকজন নির্বাচন কর্মকর্তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এসব সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে বার বার প্রমান দিয়েছে তারা গনতন্ত্র চায়না, সুশৃঙ্খল নির্বাচন চায়না এমনকি মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে দিতে চায়না। গনতন্ত্রের পথ তারা নানান জোটের সাথে সম্মিলিত ভাবে রোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে এবং গনতন্ত্রের সফল যাত্রা সমুন্নত রয়েছে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি এবং চিন্তাধারাই বিএনপিকে গ্রাস করে ফেলেছে। পতনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ালে কখনও কখনও উত্থানের দিকে মুখ ফেরানোর সুযোগ হয়ত হতে পারে। কিন্তু পতিত মানবের পক্ষে উঠে আসার পথ অতি বন্ধুর। হাত ধরে টেনে তোলাও সম্ভব নয়। ক্রেন দিয়েও নয়। বিএনপি নামক দলটি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর মতো স্বর্গীয় সুধা আস্বাদনের লক্ষ্যে নিজের পায়ে কুড়াল এমনইভাবে মেরেছে যে, পদযুগলহীন অবস্থা তার। দাঁড়াবার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। দলটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে নিমজ্জিত হয়ে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে। হঠকারিতা আর ভুল রাজনীতি শুধু নয়, বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক হয়ে টিকে থাকার শেষ চেষ্টাটুকুও আর কাজে দিচ্ছে না। দেশবাসী জানে, বেগম জিয়ার রাজনীতি ছিলো সর্বপ্রকার দুর্নীতির পরিপোষক। শহরের রাস্তায় যেমন পুঞ্জিভূত জঞ্জাল, তার সময়ের সমাজের সর্বস্তরে বিস্তৃত হয়েছে তেমনি পুঞ্জিভূত দুর্নীতি। ফলে বিএনপি এদেশে আর মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি নয় এবং তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই তারা এখন আর ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করে না এবং তাদের রাজনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতার বিপরীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছিল একজন শেখ হাসিনা। তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান, ক্ষমতা ও পলিসি মেকিংয়ের একক নিউক্লিয়াস। শেখ হাসিনার পরিপক্কতা, নেতৃত্বের দক্ষতা, ক্ষেত্রবিশেষে ইস্পাত কঠিন মনোভাব আওয়ামী লীগকে এগিয়ে রাখে অনেকটা। জনশ্রুতি আছে, শেখ হাসিনা একাধারে নিজের দল, বিরোধী দল, সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকেন। তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র পিছপা হন না। বিশ্বব্যাংক পিছিয়ে যাওয়ার পরও পদ্মাসেতু নির্মাণে হাত দেয়া বা আলোচিত-সমালোচিত দলীয় হেভিওয়েট নেতাদের নির্বাচনে বাইরে রাখার সাহস তিনি দেখিয়েছেন। দলটির বাইরে সাধারণ ভোটাররা প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর ও অনমনীয় গুণকে পছন্দ করে নিজেদের ভোটটি নৌকার বাক্সে দিয়েছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বেশিরভাগ ভোটারের সমর্থন বরাবরই পেয়ে থাকেন শেখ হাসিনা এবং তার নৌকার প্রার্থীরা। মাঠের নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারও আওয়ামী লীগকে এগিয়ে রাখে। বিশেষ করে সারাদেশে একযোগে ‘জয় বাংলা, জিতবে এবার নৌকা’ শ্লোগানটি এত বেশি শোনানো হয়েছে যেটা প্রতিপক্ষের সমর্থক, ভোটার ও কর্মীদের মনে ‘দ্বিধা’ও সৃষ্টি করে। শ্লোগানটি আত্মবিশ্বাস হারানো নৌকার সমর্থকদের উদ্বেলিত করে, সাহস যোগায়। বিপরীতে বিএনপির এমন কোন প্রচারণা চোখে পড়েনি। প্রায় আসনেই বিএনপি তাদের নির্বাচনী পোস্টারও লাগায়নি। শুধু অভিযোগ করে আসছিল, তাদের পোস্টার লাগাতে দেয়া হচ্ছে না, মাইক ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না। এর মধ্যে ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দুটি ভিডিও বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সরকারিদল ভোটারদের মেসেজ দিতে পেরেছিল যে, বিএনপি হয়তো নির্বাচন বর্জন করবে বা গোপন কোন কৌশল নেবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগনকে অন্ধকারে রাখা বিএনপি মূলত সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল যা এখনো অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।এমনকি স্থানীয় জনগন অধিকাংশই বিশ্বাস করে ড. কামাল হোসেন স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন করা ও দ-িত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাঁচাতে জোট করেছেন এবং নির্বাচনে জিতে গেলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জেল থেকে মুক্ত করে দেবেন। ড. কামাল হোসেনের একাধারে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সংহতি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, গণতন্ত্রের প্রতি আকুলতার পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত নিয়ে জোটের সিদ্ধান্ত সচেতন মানুষ ভালভাবে নিচ্ছে না। এসব কারনেও তাদের স্থানীয় জনপ্রিয়তা যাচাই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের অধিকাংশ জনগণ এমনকি বিএনপির লোকজনও স্বীকার করেন সরকার যথেষ্ট উন্নয়ন করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ সরকারের শত উন্নয়ন প্রকল্প মানুষকে আকৃষ্ট করেছে আওয়ামী লীগকে পুনরায় ভোটদানে। আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে সরকার পরিবর্তন হলে এসব বিএনপি মেগা উন্নয়ন প্রজেক্ট বন্ধ করে দেবে। দেশের উন্নয়ন ব্যহত হবে।
লন্ডন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইকনোমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদন অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের মানুষ আবারো আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করবে বলে প্রকাশ করে। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অসাধারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ও সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায় বিরোধী দলের পিছিয়ে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। আর সে কারণেই বিএনপি বা আরো বড় পরিসরে দেখলে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আরো একবার নির্বাচনে জয়ী হওয়া আবশ্যক। এ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে কৌশলগতভাবে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিবেশী ভারত, চীন ও জাপানের সহায়তায় অর্থনৈতিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে এ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়। নজর দেয়া যাক কেন বিএনপি স্থানীয় নির্বাচনে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে কেন পিছিয়ে পড়ছে। ২০১৬ এর নির্বাচনের কথা ধরা যাক, নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা বগুড়ায় পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়েও সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি। ৯টি পৌরসভার মধ্যে মাত্র ৪টিতে মেয়র পদে জয় পেয়েছেন বিএনপি মনোনীত এবং একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। আর আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন পাঁচটি পৌরসভায়। নিজেদের ঘাঁটিতে বিএনপির কেন এই ভরাডুবি? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মূলত সাংগঠনিক দুর্বলতা, ভুল প্রার্থী মনোনয়ন আর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই ভোটের রাজনীতিতে এবং জনগণের আস্থা অর্জনে তারা দিন দিন পিছিয়ে পড়েছে । তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এমনকি সাধারণ ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দকেও তোয়াক্কা করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে তারা কাহালু পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর উদাহরণ দিতে গিয়ে জানান, সেখানে যাকে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছিল সেই আবদুল মান্নানের মালিকানাধীন ইটভাটায় তিন বছর আগে এক শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় মেয়র প্রার্থী মান্নানের ছেলে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় লাগাতার আন্দোলনও হয়। জেলার সিংহভাগ স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের পরাজয় বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বকে ভাবিয়ে তুলেছিল তখনই । স্থানীয় পর্যায়ের যেসব নেতাকর্মীরা বিএনপিকে রিপ্রেজেন্ট করছে তাদের অধিকাংশই গনতন্ত্র বিরোধী এবং স্থানীয় উন্নয়নের বিরোধক হিসেবে জনগণের কাছে পরিচিত। এছাড়াও তারা এত পরিমাণ দাঙ্গা, হাঙ্গামা, আগুনসন্ত্রাস ও দেশবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত যে স্থানীয় পর্যায়ের জনগন কোনভাবেই তাদের প্রতি আস্থা রাখতে সাহস পাচ্ছে না। মুলত বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিজেরাও জানেন তাদের এহেন কর্মকান্ডের পরেও এইবারের নির্বাচনেও তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে যাওয়া সাধারণ জনগণের সাথে উপহাস করারই নামান্তর।
লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
ট্রেজারার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
ও
সাবেক চেয়ারম্যান
ট্যুরিজম অ্যান্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।