ঢাকা ১৩ মে, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
একনেক সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার ৯ প্রকল্প অনুমোদন হাম ও উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু দেশে বছরে ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু কারণ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি: তথ্যমন্ত্রী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সোলার প্ল্যান্ট বসানোর ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর এপ্রিলে ৫২৭ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ৫১০ জন নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যান্টিনে বিস্ফোরণ, দগ্ধ ১২ চূড়ান্ত অনুমোদন পেলো পদ্মা ব্যারাজ ২৭তম বিসিএসের বঞ্চিত আরও ৯৬ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন এসএসসি-এইচএসসি নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

হাজার কোটির ময়লা ড্রেনেই

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

১২ মে, ২০২৬,  11:11 AM

news image

তারপর জলাবদ্ধতার চক্রে রাজধানীবাসী

শহরকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে প্রতিবছরই শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সিটি করপোরেশন। গত দুই অর্থবছরের হিসাব বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ খাতে ব্যয় করেছে অন্তত এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ড্রেন থেকে তোলা ময়লা দিনের পর দিন পড়ে থাকে সড়কের পাশে। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয় গৃহস্থালি বর্জ্য।

এরপর এক পশলা বৃষ্টি এলেই সেই বর্জ্য ধুয়ে আবার ফিরে যায় ড্রেনে। যে জলাবদ্ধতা নিরসনে এত ব্যয়, সেই জলাবদ্ধতার চক্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজধানীবাসী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বনশ্রী এবং রামপুরায় গত রবিবার আমরা ঘুরে দেখেছি, ড্রেন থেকে যেসব কাদা, প্লাস্টিক বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা তোলা হয়েছে, সেগুলো রাস্তার পাশেই স্তূপ করে রাখা। এসব এলাকার বাড়িঘর থেকে যে ময়লা সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলোও আছে এখানে।

এর ফলে কিছু এলাকায় সড়ক ছোট হয়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় ভোগান্তি মানুষের, পথ চলতে হচ্ছে নাকে রুমাল বা হাত চেপে।

ঠিক পরদিন, অর্থাৎ গতকাল সোমবার এক পশলা বৃষ্টির পর আমরা আবার যাই ওই সব এলাকায়। এবার দেখা গেল, বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে শুদ্ধ হয়ে ওই ময়লা আবার গেছে ড্রেনে।

এতে প্রত্যেকটি সড়ক হয়ে উঠেছে জলমগ্ন। ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে একদম ধীরগতিতে। অল্প সময়ের বর্ষণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বহু এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে।

ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন করেন, বছরের পর বছর দুই সিটি থেকে ড্রেন পরিষ্কারের যে অভিযান পরিচালিত হয়, তার সুফল কোথায়? মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতার কারণে কোটি কোটি টাকা জলে ঠেলে দিচ্ছে সিটি করপোরেশন? স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, ড্রেন থেকে ময়লা তুলে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাকে ভরে সরিয়ে নিলে এ পরিস্থিতি দেখতে হয় না।

কিন্তু বাস্তবে দিনের পর দিন ময়লা রাস্তায় পড়ে থাকে। এগুলো শুকিয়ে ধূলিকণার সঙ্গে মিশে জনস্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাবে প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাট, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এই বিষয়গুলো সবাই জানেন। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; বরং ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতা। তাঁদের ভাষ্য, ড্রেন পরিষ্কারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বর্জ্য দ্রুত ও সঠিকভাবে অপসারণ করা। তা না হলে পুরো প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ময়লা তো কেউ নেয়নি। বৃষ্টি হলেই আবার ড্রেনেই চলে গেছে। তাহলে এত টাকা খরচ করে পরিষ্কার করার মানে কী? ড্রেন থেকে ময়লা তুলে যদি এক সপ্তাহ রাস্তায় ফেলে রাখে, তাহলে আগের অবস্থাই ভালো ছিল। অন্তত রাস্তা চলাচলের উপযোগী থাকত।’

মোহাম্মদপুরে গেলে রিকশাচালক রহমত আলী বলেন, ‘রাস্তার ওপর এই পচা ময়লা তিন দিন আগে রাইখা গেছে। দুর্গন্ধে মোড়ে দাঁড়ানো যায় না। আজকের বৃষ্টিতে এই কাদা আবার ড্রেনেই গেছে।’

নিকুঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, প্রতিবছরই শুনি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই সব প্রস্তুতির বাস্তবতা বোঝা যায়। পানি জমলে শুধু রাস্তা নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনও থেমে যায়।

ধানমণ্ডিতে রাসেল স্কয়ার থেকে গ্রিন রোড চৌরাস্তা, সেখান থেকে পান্থকুঞ্জ পার্ক হয়ে সোনারগাঁও হোটেলের পেছন পর্যন্ত গ্রিন রোড-পান্থপথ বক্স কালভার্ট। ১৯৯৩ সালে নির্মিত দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ওই কালভার্টের ভেতরেও আবর্জনা রয়েছে। আলাদা কোনো লাইন না থাকায় কালভার্ট পথে বিভিন্ন বাসাবাড়ির কঠিন ও পয়োবর্জ্য হাতিরঝিলে ঢুকে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, একটু ভারি বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে যায়। প্রতিবছর শুনি ড্রেনেজ সিস্টেম ঠিক করা হবে কিন্তু  অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেই একই ধরনের ভোগান্তি হয়।

উত্তরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় সারি সারি ভ্রাম্যমাণ দোকান। এখানকার ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ফেলা হচ্ছে ঢাকনাহীন ড্রেনে। অবৈধ এসব দোকানপাট উচ্ছেদে কোনো উদ্যোগই নেয়নি সিটি করপোরেশন। ফলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

১৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সাল থেকে আমরা নিয়মিত ট্যাক্স দিয়ে আসছি। কিন্তু তারা আমাদের কোনো সেবাই দিচ্ছে না। এই সেক্টরে ড্রেনেজব্যবস্থা ভয়াবহ। অধিকাংশ ড্রেনের ঢাকনা নেই।

৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা ড্রেনগুলো সংস্কারের জন্য সিটি করপোরেশনকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও তারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ড্রেনগুলো সংস্কার করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।’

১৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখানকার অধিকাংশ সড়কই ভাঙাচোরা এবং ড্রেন না থাকায় অল্প বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। বৃষ্টি ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে রাস্তায় পানি জমে থাকে। এতে চলাফেরায় মারাত্মক অসুবিধা পোহাতে হয়।’

সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতার কুফল : চলতি মাসের শুরুতে একদল পরিচ্ছন্নতাকর্মী বনশ্রী এ ব্লকের ড্রেন পরিষ্কার শুরু করেন। ভেতরে জমে থাকা বর্জ্য তুলে রাখে ম্যানহোলের পাশে। কিন্তু কাজ শেষে তা আর সরানো হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেসব বর্জ্য একই জায়গায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যেই কয়েক দফা বৃষ্টিতেই সেব বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে ড্রেনে ফিরে গেছে।

ড্রেন পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তাদের দাবি, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করেন এবং নির্দেশনার বাইরে কথা বলার সুযোগ নেই।

এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাজ ময়লা তোলা। কোথায় রাখা হবে বা কখন সরানো হবে, সেটা আমাদের দায়িত্ব না।’

স্থানীয়দের মতে, এ বক্তব্যই পুরো সমস্যার মূল চিত্র তুলে ধরে। তাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে পুরো প্রক্রিয়াই ভেঙে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল আলম বলেন, ‘এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা আবার রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। পরে বৃষ্টি হলে সেগুলো আবার ড্রেনে ফিরে যায়। এরপর আবার নতুন করে পরিষ্কার দেখানো হয়। এটা যেন এক ধরনের চক্র।’

রহমত উল্লাহ নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন কাজ করে ঠিকই, কিন্তু সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। একবার বৃষ্টি হলেই তোলা ময়লা আবার গর্তে ফিরে যায়। তাহলে এই কষ্ট করে ড্রেন পরিষ্কারের লাভ কী? এটা তো স্রেফ অর্থের অপচয়।’


সেগুনবাগিচা, মতিঝিল, ফকিরাপুল, দিলকুশা, আরামবাগ ও বক্স কালভার্ট সড়ক ঘুরেও একই অবস্থা দেখা গেছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচ থেকে কাজলা পর্যন্ত সড়কে ড্রেনের ময়লা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে পুরো সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও দুর্গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে।

ব্যয় বাড়ছে, মিলছে না দৃশ্যমান সুফল : জলাবদ্ধতা নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এত ব্যয়ের পরও রাজধানীবাসী কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পাচ্ছে না। বরং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, ডেন উপচে সড়কে পানি ওঠা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আগের মতোই রয়ে গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেই ব্যয় হয়েছে অন্তত ৫০১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৮৫ কোটি টাকা, খাল ও লেক উন্নয়নে ৩০ কোটি টাকা, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ১৮ কোটি টাকা এবং খাল পরিষ্কারকরণে ১২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া নর্দমা ও ড্রেন পরিষ্কারকরণে দুই কোটি টাকা, পাম্পহাউস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১১ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৪১ কোটি টাকা এবং সেকেন্ডারি বর্জ্য ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

এ ছাড়া আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে এককভাবে ব্যয় করা হয়েছে আরো ২৬০ কোটি ১০ লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এই খাতে ব্যয় আরো বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৭৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাস্তবে এই ব্যয় আরো বাড়তে পারে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২৬ কোটি টাকা, খাল ও লেক উন্নয়নে ৩৮ কোটি টাকা, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ২৫ কোটি টাকা এবং খাল পরিষ্কারকরণে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ড্রেনেজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১০ কোটি টাকা, পাম্পহাউস রক্ষণাবেক্ষণে ১৫ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১৭০ কোটি টাকা এবং সেকেন্ডারি বর্জ্য ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরেও ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

তবে নগর বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন বর্ষা এলেই একই ধরনের জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য সংকট ফিরে আসে? তাঁদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

কোটি টাকা জলে ঢালার মানে কী? : জানা গেছে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন ড্রেনেজ লাইন পরিষ্কার কার্যক্রমে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু বাস্তবে জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি থামছে না। কারণ ড্রেন পরিষ্কারের পর উত্তোলিত বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় তা আবার ড্রেনে ফিরে যাচ্ছে। ফলে পুরো কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে খালগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তবে তা সমন্বিত নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে খাল রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ফল পাওয়া যাবে না।

নগর বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন মৌসুমি দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে কোথাও ড্রেন নির্মিত হলেও সংযোগ নেই, কোথাও খাল খনন করা হলেও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত থাকে।

দায় এড়াতে অসিলা খোঁজে সিটি করপোরেশন : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, খালের নিয়মিত পরিচর্যা না হওয়ায় অবৈধ দখলদাররা স্থাপনা গড়ে তুলেছে। অনেক জায়গায় খালের মাঝখানে বাঁশ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে, যা পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।

ডিএনসিসির সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, ‘আমরা খাল ও ড্রেনের ক্যাচপিট পরিষ্কার করছি। গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর পানিপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য কর্মীরা নিয়মিত মাঠে কাজ করছে।’

তবে তিনি অভিযোগ করেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়নকাজের কারণে কুড়িল ও বিমানবন্দর সড়কের অনেক ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে।

মিরপুর এলাকার জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মিরপুর একসময় রিটেনশন পন্ড ছিল। নিচু এলাকা হওয়ায় ঢাকার বেশির ভাগ পানি এখানে এসে জমে। কিন্তু জলাধার ভরাট করে বসতি গড়ে ওঠায় পানি নামার পথ কমে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায় মেট্রো রেল নির্মাণকাজের সময় কিছু পানি নিষ্কাশন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি মেরামত হয়নি।

দুই সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে রাজধানীতে ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১০৮টি এবং দক্ষিণে ৩৩টি এলাকা রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি আউটলেট আছে। অথচ প্রয়োজন অন্তত আটটি। পুরান ঢাকা, নিউমার্কেট ও ধানমণ্ডি এলাকায় কার্যকর কোনো আউটলেট নেই।’

তিনি জানান, দ্রুত পানি সরাতে ১০টি পোর্টেবল পাম্প সংগ্রহ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘মোটর চালানোর মতো অবস্থা থাকলে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে পানি সরানো সম্ভব।’

এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ড্রেনেজ লাইনগুলো ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন মিলে পরিষ্কার করে। কিছু ক্ষেত্রে ময়লা তোলার পর দ্রুত অপসারণ না করায় সমস্যা হয়। বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে।’ তবে তিনিও স্বীকার করেন, মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম