ঢাকা ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
জাতীয় প্রেসক্লাবে এলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন শেরপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযান ৩ কোটি টাকার ট্যাপেনটাডোল জব্দ সন্ধ্যায় ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা–ছেলের মৃত্যু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যত সুবিধা পাবেন আর সক্রিয় থাকবে না প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল পেজ গুরুত্বপূর্ণ ৫ মন্ত্রণালয় নিজের অধীনে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ইসিকে চিঠি

রোজায় বাজার নিয়ন্ত্রণই বড় পরীক্ষা

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,  10:59 AM

news image

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই নতুন সরকারকে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙা এবং দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন তাদের জন্য তাৎক্ষণিক এক বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর গতকাল মঙ্গলবার সরকার গঠন করেছে দলটি। আর এ সময় শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। সরকারি সূত্র বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে। চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিবছর ‘মজুদ পর্যাপ্ত’ ঘোষণার পরও বাজারে তার প্রতিফলন স্পষ্ট থাকে না। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট থেকেই যায়।

নিম্ন আয়ের মানুষের চাপ কমাতে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। খোলাবাজারে টিসিবির ট্রাক সেলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা হবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে শহরাঞ্চলে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে যেসব এলাকায় টিসিবির ট্রাক সেল পৌঁছবে না, সেখানে বাজারদরের চাপ বহাল থাকবে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।

কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহের বাস্তবতা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—লেবু বা বেগুনের মতো পণ্যে মজুদের বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। মৌসুমি উৎপাদন ও পরিবহনের ওপরই দাম নির্ভর করে। কৃষক পর্যায়ে ৪০ টাকা কেজির বেগুন শহরের খুচরা বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া বাজারকাঠামোর গলদেরই ইঙ্গিত দেয়। মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ চেইনের অস্বচ্ছতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এবার কঠোর নজরদারি থাকবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এবারের রমজানের পণ্য আমদানি ও মজুদের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। তাই রোজার শুরুতে দাম হঠাৎ বাড়লেও তার পুরো দায় নতুন সরকারের ওপর বর্তাবে না। কিন্তু দামের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে তারা কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই থাকবে জনদৃষ্টি।

এ বিষয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এটি চ্যালেঞ্জিং, তবে অসম্ভব নয়। সরকার যদি শুরু থেকেই বাজার ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলে, সেখানে সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ, নিয়মিত তদারকি ও তথ্যের স্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করলে ইতিবাচক ফল মিলবে।’

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়েও বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেনের ভাষায়, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে রোজার ঠিক আগমুহূর্তে। তাই এটি তাদের জন্য বড় পরীক্ষা। আগের সরকার বাজারে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। নতুন সরকার যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।’ পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বাজার প্রস্তুতি নিয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগাম ও সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েছি। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং বন্দর থেকে দ্রুত খালাস নিশ্চিত করা হয়েছে। চিনি ও সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে আগাম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে; কোথাও কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি হিসাবে, ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টন, যার মধ্যে রমজানে লাগে প্রায় তিন লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন পাঁচ লাখ টন; আমদানি ও পাইপলাইনে মিলিয়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। মসুর ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ছোলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজে স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি, এ তথ্য বাজারে স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত দুই দিনের ব্যবধানে বেগুন ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা এবং শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য সব ধরনের সবজির দামও বেড়েছে। ছোলার কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, দেশি চিকন মসুর ডাল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, মোটা দানার মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, ডিম প্রতি ডজন ১১০ থেকে ১২০ টাকা এবং চিনি প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া। ছোট লেবুর হালি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বড় লেবু ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. মিলন খান বলেন, ইফতারের প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো গত দুই দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, দৃশ্যমান শাস্তি এবং সমন্বিত নীতিই বাজার স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে রমজানের প্রথম সপ্তাহেই। ভোগ্যপণ্যের সাবলীল সরবরাহ, দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি—তিন উপাদানই নির্ধারণ করবে নতুন সরকারের প্রথম রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার সাফল্য।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম