কক্সবাজারে বন্যার ভয়াবহতা: রোহিঙ্গাসহ নিহত ৩২, ক্ষতিগ্রস্ত ১৬১৩ বসতবাড়ি
নিজস্ব প্রতিনিধি
১৪ জুলাই, ২০২৬, 11:01 AM
নিজস্ব প্রতিনিধি
১৪ জুলাই, ২০২৬, 11:01 AM
কক্সবাজারে বন্যার ভয়াবহতা: রোহিঙ্গাসহ নিহত ৩২, ক্ষতিগ্রস্ত ১৬১৩ বসতবাড়ি
কক্সবাজারে টানা ৯ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিরূপণ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণহানি, বসতবাড়ি, সড়ক, বেড়িবাঁধে ভাঙনসহ ব্যাপক ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা। যেখানে ৯৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এরপর মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। অন্যদিকে রামু উপজেলার ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৪ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া একজন নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়া উপজেলায়। সেখানে পাহাড়ধসে ১৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক সমন্বিত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার এবং ২৪ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মোট ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়ায়। উপজেলাটিতে ৪৫০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরপর রয়েছে চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি এবং মাতামুহুরীতে ১৯০টি বসতবাড়ি। এছাড়া টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদরে ১৮ টি।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, মাতামুহুরি উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা।
চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলার তালিকা এখনো জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছেনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ৯ দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। প্লাবিত এলাকার মানুষদের ৭৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা ৯ দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অপরদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। সূত্র : বিডি প্রতিদিন