অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার জেরে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে শরণার্থী স্কুল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ জুলাই, ২০২৬, 11:13 AM
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ জুলাই, ২০২৬, 11:13 AM
অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার জেরে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে শরণার্থী স্কুল
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক প্রচারণা ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের কারণে শরণার্থী শিশুদের জন্য পরিচালিত একের পর এক শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে দেশটিতে বসবাসরত হাজারো রোহিঙ্গা শিশুর পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
১২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশু নুর গত জুন থেকে আর স্কুলে যেতে পারছে না। স্কুলে যাওয়ার পথে দুই ব্যক্তি তাকে মারধরের হুমকি দেওয়ার পর নিরাপত্তার কারণে পরিবার তাকে আর বাইরে পাঠায়নি। নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে নুর জানায়, ওই ব্যক্তিরা তাকে বলেছিল, “তুমি স্কুলে যেতে চাও কেন? আমাদের দেশ দখল করতে চাও?”
অধিকারকর্মী ও শিক্ষকদের ভাষ্য, নুরের মতো আরও অনেক রোহিঙ্গা শিশু একই ধরনের হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে শরণার্থী শিশুদের জন্য পরিচালিত বেসরকারি শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর ওপরও। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত নয়টি শরণার্থী স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ বলেন, অনেক শিশু এখন এতটাই আতঙ্কিত যে ঘরের বাইরেও বের হতে চায় না। তার মতে, শিশুদের দীর্ঘ সময় ভয়ের মধ্যে রাখলে তা তাদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে।
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। সরকার তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে, দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন।
রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য সরকারি স্কুলের দরজা খোলা না থাকায় তাদের শিক্ষা মূলত বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত স্কুল ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্পও খুব সীমিত হয়ে পড়ে।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত মে মাস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা নতুন করে বেড়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস ও টিকটকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু পোস্টে এমনকি রোহিঙ্গা ও তাদের শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
থ্রেডসে একটি আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘লেমপাং রোহিঙ্গা’, যার অর্থ ‘রোহিঙ্গাকে চড় মারো’। কিছু অনলাইন ব্যক্তিত্ব রোহিঙ্গা বসতির ভিডিও ধারণ করে তাদের অবস্থান কর্তৃপক্ষকে জানানোরও আহ্বান জানিয়েছেন।
জুনে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে একটি অনলাইন আবেদন চালু হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের পর সেটি সরিয়ে নেওয়া হলেও এরই মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
রোহিঙ্গাবিরোধী উত্তেজনা নতুন নয়। করোনা মহামারির সময়ও তাদের বিরুদ্ধে রোগ ছড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান এবং কর্মসংস্থানে প্রতিযোগিতা তৈরির মতো নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা সেই উত্তেজনাকে আবারও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘আর্টিকেল ১৯’ বলেছে, অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। তবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানবাধিকারভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে বাড়তে থাকা ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য ও মানবিক মর্যাদা অস্বীকারের প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া পরিচালিত হওয়ায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। দেশটিতে শরণার্থীদের আইনগতভাবে কাজ করার অনুমতিও নেই।
এদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলোর শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক রোহিঙ্গা শিশুকে সরকারি খেলার মাঠ থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি চালু থাকা স্কুলে নিরাপত্তা বাড়াতে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরা বন্ধ করা হয়েছে এবং বাইরের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে।
অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকলে এর সামাজিক প্রভাব আরও বড় হতে পারে। কিশোরীদের অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার অনেক শিশু রাস্তায় ঘোরাফেরা বা ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনায় পাঠানো ১০টি পোস্টের মধ্যে মেটা সাতটি এবং টিকটক ১১টির মধ্যে আটটি পোস্ট সরিয়ে নিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, অনেক ক্ষতিকর পোস্ট এখনো অনলাইনে রয়ে গেছে।
মেটা ও টিকটক জানিয়েছে, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে তারা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির পাশাপাশি মানব পর্যালোচনাও ব্যবহার করে। তবে স্থানীয় ভাষা, সাংকেতিক শব্দ ও ছবির সূক্ষ্ম অর্থ শনাক্তের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকার কথাও জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন নুরের মতো বহু শিশুর সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। নুরের ভাষায়, “আমি যদি স্কুলে যেতে না পারি, তাহলে কিছুই শিখতে পারব না। আর জীবনে কিছুই হতে পারব না।” সূত্র : রয়টার্স।