ঢাকা ১৭ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
নরসিংদীতে পানিতে ডুবে ৪ মাদরাসাছাত্রীর মৃত্যু দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু আবু সাঈদের রক্তের দায় এখনো শোধ হয়নি: চরমোনাই পীর জিয়াউর রহমান হত্যা: পলাতক মেজর মোজাফফর আটক তালাকের অজুহাতে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না : হাইকোর্ট যেভাবে হজে যাবেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাতারের সাবেক আমিরের স্মরণে রাজধানীতে সড়কের নামকরণের নির্দেশ ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে একটি গোষ্ঠী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনলাইন জুয়া ও সাইবার ক্রাইম পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ: আইজিপি

“বেশির ভাগ সূচকেই পাকিস্থানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে”

#

০৭ এপ্রিল, ২০২৩,  7:13 PM

news image

                                                    || অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া || 


পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে জিডিপির আকারের ভিত্তিতে বৃহৎ অর্থনীতির দেশের তালিকায় ৩৫তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। স্বাধীন হওয়ার পর ক্ষুধার্ত জনগণকে যখন দু'বেলা খাইয়ে রাখা কষ্টকর সেখানে ঘুরে দাঁড়ানো যেন অবাস্তব। এমন অবস্থায় বহির্বিশ্ব বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করত। অথচ স্বাধীনতার ঠিক পঞ্চাশ বছর পর এসে সেই দেশটি এখন অর্থনীতিতে আশাজাগানিয়া একটি দেশ। কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, এশিয়া অন্যতম সেরা অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব সূচকে সেই পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ, বেশকিছু সূচকে ভারতকেও পিছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের বিষয় আলোচিত হচ্ছে অনেকদিন থেকে। প্রশংসা আসছে স্বয়ং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও।

'দ্য বাংলাদেশ মডেল' শিরোনামে এই লেখায় বাংলাদেশকে পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ নিয়ে পাকিস্তানে হয় ব্যাপক আলোচনা। পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা দুই দেশের বিভিন্ন সূচকে অবস্থান পরিষ্কার করেন এবংবাংলাদেশকে তাদের জন্য উন্নয়নের মডেল হিসেবে চিহ্নিত করেন। সম্ভবত এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বিজয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে টকশোর একজন পরিচিত মুখ উন্নয়ন পরামর্শক জাইঘাম তার 'দ্য বাংলাদেশ মডেল'-এ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। যেহেতু সামাজিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচারের দিক থেকে দেশ দুটির বৈশিষ্ট্যগত মিল রয়েছে তাই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি বাংলাদেশকে ফলো করার কথা বলেন। অবশ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ১০টি সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও পাকিস্তানের পিছিয়ে পড়া তার এই মডেলটির যৌক্তিকতা নির্দেশ করে। নিউইয়র্কভিত্তিক একটি জনপ্রিয় বিজনেস পোর্টাল কোয়ার্টজ ডটকম বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে অগ্রসরমান এশিয়ার অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এটি বিশ্বের একমাত্র দেশ ২০২০ এবং ২০২১ এই বছরেই যাদের প্রবৃদ্ধি হবে ২ শতাংশের বেশি।

যে পাকিস্থান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, ৫২ বছরে সেই পাকিস্থানকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রায় সব সূচকেই টপকে গেছে বাংলাদেশ।একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে অনেক দেশের কাছে অনুকরণীয়।১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই বাজেট আজ  পরিণত হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকায়। সেদিনের ১২৯ ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশটিতে আজ মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। সময় পেরিয়েছে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়েছে।বাংলাদেশকে যাত্রার শুরুতে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হলেও এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রায় সব সূচকেই পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে।মাথাপিছু আয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং সম্পদ উৎপাদন ও আহরণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।স্বাধীনতার পর প্রায় শূন্য থেকে শুরু করলেও ৫২ বছরে এসে দারিদ্র্য আর দুর্যোগের সেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ আর্থসামাজিক প্রতিটি সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পাকিস্তানের তুলনায় বেশি সুসংহত বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এক বছর ধরে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান যে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ভুগছে, সেই তুলনায় বাংলাদেশ ভালো আছে।স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৮০ টাকা, যা তৎকালীন ৯৪ মার্কিন ডলারের সমান। মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার ছাড়াতে ৩১ বছর সময় লাগে বাংলাদেশের।২০১২-১৩ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫৪ ডলার। পরের সাত বছরেই তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দ্রুত বাড়তে থাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সঙ্গে বাড়ে মাথাপিছু আয়। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়কে ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। ওই অর্থবছরে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় হয় ১ হাজার ৪৫৯ ডলার। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫১ ডলার। এভাবেই স্বাধীনতার ৪৫ বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের লড়াইয়ে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৯৩ ডলার। স্বাধীনতার পর মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ।রপ্তানি আয়েও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন পোশাক রপ্তানিতে সারা বিশ্বে দ্বিতীয়। সব মিলিয়ে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান গত অর্থবছরে ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় এখন ৬০ শতাংশ বেশি।কোভিড মহামারি ও এর পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ইউক্রেন যুদ্ধএসব কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা বিঘিœত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ার কারণেও মারাত্মক সমস্যায় পড়ে অনেক দেশ। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আছে দুই দেশেই।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশে। গত ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি প্রায় অপরিবর্তিত আছে। তবে কোনোটিই দুই অঙ্কের ঘরে নেই।অন্যদিকে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি এখন অতিমাত্রায় বেশি। মূল্যস্ফীতির চাপে পাকিস্তানের মানুষ পিষ্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২৭ শতাংশ। দেশটির গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ৩৫ শতাংশ, শহরে ২৩ শতাংশের মতো ও গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪৭ শতাংশ।এছাড়াও বৈদেশিক রিজার্ভ, সাক্ষরতা হার,গড় আয়ু সকল সূচকে পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। 

এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয় প্রায় প্রতিবছর। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে রপ্তানি, রিজার্ভ, জিডিপি থেকে শুরু করে দেশের বাজেটের আকার, রাজস্ব আয়, রেমিট্যান্স, দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়নে সাফল্য এসেছে। এসব সূচকে পাকিস্তানকে পিছনে ফেলা সম্ভবত যুদ্ধের ৫০ বছরে বাংলাদেশের সব থেকে বড় অর্জন।বাংলাদেশ শেখ হাসিনার গত এক যুগের শাসনামলে এগিয়ে গেছে দুর্বার গতিতে। বেশকিছু সামাজিক সূচকের পাশাপাশি অর্থনীতির সূচকেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। এমডিজি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, এসডিজি বাস্তবায়নের পথে। মাত্র এক যুগ আগেও যে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় দ্বিগুণ ছিল, তারাও পেছনে পড়ে যাচ্ছে। একসময়ের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ বিশ্ব দরবারে উদীয়মান অর্থনীতির রোল মডেল যার নেতৃত্বে, কৃতিত্ব তো সেই ‘ক্যারিশমাটিক’ নেত্রী শেখ হাসিনাকে দিতে হবেই। বাংলাদেশের জনগণ তার ওপরে আস্থা রেখে তাকে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করবার সুযোগ করে দিয়েছে। আগামী ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  বাংলাদেশের জনগণ একই রকমভাবে তার উপরে বিশ্বাস রাখবে কারণ এই মুহূর্তে আমাদের সকলের মাথায় যে বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত সেটি হচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বিকল্প এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ যেমন সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঠিক তেমনিভাবে শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের আরেক নাম হয়ে উঠেছেন। ফলে, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি এবং উন্নয়ন ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছেন।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
ট্রেজারার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক চেয়ারম্যান
ট্যুরিজম অ্যান্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম