“বিএনপি-জামায়াতের লবিষ্ট রাজনীতির নতুন প্রজেক্ট”
০৬ জুন, ২০২৩, 10:42 PM
NL24 News
০৬ জুন, ২০২৩, 10:42 PM
“বিএনপি-জামায়াতের লবিষ্ট রাজনীতির নতুন প্রজেক্ট”
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন প্রশাসন ও ইউরোপ ইউনিয়নে বিএনপি-জামায়াত জোট লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে যা বিএনপি-জামায়াতের লবিষ্ট রাজনীতির নতুন প্রজেক্ট। লবিস্ট নিয়োগে ৪০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করেছে তারা। নিজের দেশের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের ঘটনা নজিরবিহীন। দেশের রপ্তানি–বাণিজ্য ধ্বংস করতে বিদেশে দেশের বিরুদ্ধে চিঠি দেওয়া ও লবিস্ট নিয়োগ করা দেশদ্রোহী কাজ। বিএনপি ২০১৭ সাল পর্যন্ত৪টি এবং ২০১৯ সালে ১টি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে জামায়াত-বিএনপি ৩টি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে। ২০১৪ সালে জামায়াত ১টি ফার্ম নিয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য। এ জন্য তারা দেড় লাখ ডলার দেয়। বিচার বন্ধে তারা আরেকটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রভাবিত করার জন্য পিস অ্যান্ড জাস্টিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৩২ হাজার ডলার দিয়ে নিয়োগ করে। বিএনপি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত২৭ লাখ ডলার, প্রতি মাসে রিটেইনার ফি ১ লাখ ২০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। বিএনপির সঙ্গে যে কয়টি লবিস্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্রের কথা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে ব-ু স্টার স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি, রাস্কি পার্টনারস, একিন গাম্প স্ট্রস হাউয়ার অ্যান্ড ফেল্ড এলএলপি, পিলসব্যারি উইথ্রপ শ পিটম্যান এলএলপি এবং করভিস কমিউনিকেশনস। এগুলোর মধ্যে একিন গাম্প স্ট্রস হাউয়ার অ্যান্ড ফেল্ড এলএলপি বিএনপিকে তাদের পক্ষে কাজ করার প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্তকোনো চুক্তি হয়নি। করভিস কমিউনিকেশনস একবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিতরণের কাজ করলেও কোনো আর্থিক লেনদেনের ঘোষণা দেয়নি, যা থেকে ধারণা হয়, তাদের সঙ্গেও দলটির কোনো চুক্তি হয়নি। পিলসব্যারি উইথ্রপ শ পিটম্যান এলএলপিই হচ্ছে দলটির প্রথম লবিস্ট, যারা কাজ করেছে
২০০৭ সালে এবং তার জন্য তারা পেয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবন এবং নির্বাচন ত্বরান্বিত করা। বাকি দুটি—ব-ু স্টার স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি ও রাস্কি পার্টনারস বিএনপির জন্য কাজ করেছে ২০১৮-১৯ সালে এবং তার জন্য বিএনপির কাছ থেকে ব-ু স্টার ২ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৯ ডলার দাবি করেছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯০ ডলার তারা পেয়েছে। একই সময়ে রাস্কি পার্টনারস পেয়েছে ৮৬ হাজার ৬২৭ ডলার। তবে রাস্কি ছিল ব-ু স্টারের ঠিকাদার এবং তাদের কাছ থেকেই তারা তাদের ফি গ্রহণ করেছে বলে ঘোষণা দেওয়ায় বোঝা যায় না যে সেই অর্থকি বিএনপি আলাদাভাবে পরিশোধ করেছে, নাকি তা ব-ু স্টারকে দেওয়া অর্থের অংশ। সবার জন্য উন্মুক্ত কাগজপত্রে অঙ্কটি পাঁচ লাখও হয় না। সুতরাং, সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে সব কাগজপত্র প্রকাশ করা। ওই একই ওয়েবসাইটে আওয়ামী লীগ নাম দিয়ে অনুসন্ধান করলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির দুই বছর আগেই তারা লবিস্ট নিয়োগ করেছে। অ্যালক্যাড অ্যান্ড ফে নামের লবিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রথম চুক্তিটি করা হয় ২০০৪ সালের ২৯ নভেম্বর, যা কার্যকর হয় ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। প্রকাশিত চুক্তির শর্তে দেখা যায়, তাদের মাসিক ফি ছিল ৩০ হাজার ডলার (২৪ লাখ টাকা) করে। ফির বাইরে অন্যান্য খরচ, যেমন গণমাধ্যম বা গবেষকদের সফরের খরচ আলাদাভাবে পরিশোধের কথাও চুক্তিতে বলা আছে। কিন্তু তার হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগ লবিংয়ের জন্য খরচ করেছে অন্তত ৯ লাখ ডলার। সেই অর্থের উৎস সম্পর্কেও নিশ্চয়ই আমাদের জানার অধিকার রয়েছে? নাকি দুই দলের জন্য আইন আলাদা? ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথি বলছে, আওয়ামী লীগকে প্রস্তাবটি দিয়েছিল অ্যালক্যাড অ্যান্ড ফে এবং সেই প্রস্তাবে ছিল বিএনপির সরকার কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে এবং বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদীদের উপস্থিতিকে সরকার উৎসাহিত করছে, যাদের আল-কায়েদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও তাদের প্রতি তারা সহানুভূতিশীল। বাংলাদেশের এ পরিস্থিতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের সচেতন করা এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক ঘটনাপ্রবাহ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর জন্য কাজ করার কথা ছিল সেই প্রস্তাবে। নির্বাহী বিভাগে হোয়াইট হাউস, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দপ্তর, কংগ্রেস, গণমাধ্যম, থিঙ্কট্যাংক, বণিকসভা ও বাংলাদেশ-আমেরিকান সামাজিক সংগঠনগুলোয় এসব লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার অঙ্গীকার করে অ্যালক্যাড অ্যান্ড ফে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নির্বাচন ত্বরান্বিত করার সামগ্রিক লক্ষ্যের কথাই বিচার দপ্তরের নির্ধারিত ফরমে বলা আছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, লবিস্টরা এমন সব বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যেগুলো দেশের মানুষ জানলে ধিক্কার দেবে। বিএনপি লবিস্টের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে আমেরিকাকে বাংলাদেশে সাহায্য–সহায়তা বন্ধ করে দিতে বলেছিল। উন্নয়ন যেন ব্যাহত হয়, সে জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বলেছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দপ্তরের সাইটে যেসব চিঠি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে অনেক ফারাক দেখা যায়। তাই আমরা চাই, মন্ত্রীর বক্তব্যের সমর্থনে সরকারের কাছে কী নথি আছে, তা প্রকাশ করা হোক। আমরা দেখছি, দুই দলই একই ধরনের লবিং করিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এখন শুধু একটি দলের। পয়সা খরচ করে লবিং করা ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং অন্য অনেক দল তাদের নীতি-আদর্শের পক্ষে বিদেশিদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা অনেক দিন ধরেই করে আসছে, কেউ প্রকাশ্যে, কেউ অপ্রকাশ্যে। বিদেশিরা সমর্থন দিলে সেটাকে বড় করে প্রচারও নতুন কিছু নয়। কিন্তু গোপনীয়তা ও সত্য অস্বীকার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কথাটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। দলের বাইরে সরকারের লবিংয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। লবিংয়ের জন্য সরকার করদাতাদের টাকা যথেচ্ছ খরচকরতে পারে না, যাকে মন্ত্রীরা পি আর ফার্ম বলে অভিহিত করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সাইটের তথ্য দেখে মনে হয়, দূতাবাসের কর্তাদের লেখা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আর নানা ধরনের প্রচারপত্র বিতরণই ছিল বিজিআর এলএলসির প্রধান কাজ। এই কাজের জন্য তো সেখানে ওয়াশিংটনে প্রেস মিনিস্টার ও নিউইয়র্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আছেন, যাঁদের বেতনভাতার মোট পরিমাণ লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অর্থের সমান বা কাছাকাছি হবে। তাহলে একই কাজের জন্য দুই জায়গায় পয়সা ঢালা কেন? ওই সব সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কয়টি সেখানকার গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে? এগুলোর নিরীক্ষা এবং অপচয় বন্ধ ও তার জন্য জবাবদিহি প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যে রাজনৈতিক দল দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সে দলের দেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই।