“পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কারাগারে, তাদের বিষয়ে বিবৃতি কই”
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 5:27 PM
NL24 News
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 5:27 PM
“পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কারাগারে, তাদের বিষয়ে বিবৃতি কই”
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
গনতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন বিষয়গুলো সার্বজনীন। দেশ, কাল, পাত্র ভেদে এগুলোর ব্যাখ্যা সংজ্ঞা প্রয়োগ এর ক্ষেত্রে দ্বিচারিতা দ্বিমুখিতা কখনই কাম্য নয়। যুগে যুগে আইনের শাসনের পক্ষে যারা সোচ্চার হয়েছেন, দেশ-কাল-পাত্র ভেদে তারা তাদের মতামত অভিপ্রায় কখনো বদলাননি। বাংলাদেশে আইনের শাসন নিশ্চিত হওয়ার পক্ষে যারা বিভিন্ন সময় সোচ্চার হয়েছেন তাদের মতামতকে সর্বদাই সাধুবাদ জানাই। বাংলাদেশে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে অনেক অন্তরায় থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় আইনের শাসনের পথে বাংলাদেশ বহুদুর এগিয়েছে। বিচার বিভাগ স্বাধীন অ নিরপেক্ষভাবে তার কার্যাবলী চালিয়ে যেতে পারছে। তার একটি অন্যতম উদাহরণ হল ষোড়শ সংশোধনী আদালত কর্তৃক বাতিল ঘোষণা হওয়া। বিচারকার্যক্রম যেন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে সেজন্য বিচারবিভাগের উপর নির্বাহী হস্তক্ষেপ না করা অন্যতম বাঞ্ছনীয় বিষয়। এর প্রেক্ষাপটে, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বের প্রায় ১৮৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যার মধ্যে রয়েছেন ১০০ এর উপরে নোবেল বিজয়ী, রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনসহ আরও অনেক নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। তারা আমাদের আইনের শাসনের অগ্রগতি কামনা করেছেন সেটাকে সাধুবাদ জানাই, তবে তারা যেভাবে ড ইউনুসের বিচারকার্যক্রম বন্ধের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তা মোটেও আইনের শাসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা নয়। ইউনুসকে বিচারিক হয়রানি করা হচ্ছে বলে যে দাবি তারা করেছেন, তা তাদের তথ্যের অসম্পূর্ণতা ও বিভ্রাটেরই পরিচায়ক। ইউনুসের বিরুদ্ধে চলমান যে মামলা তা সরকারের করা কোন মামলা নয়। ইউনুসের বিরুদ্ধে যে মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলমান তা শ্রম আইনের ধারায় করা। শ্রম আইনে সুস্পষ্ট বলা আছে ব্যবসায়িক লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিককল্যাণ তহবিলে প্রদান করতে। এখানে ইউনুসের বিরুদ্ধে যারা মামলা করছেন তারা তার প্রতিষ্ঠানেরই সংক্ষুব্ধ কর্মচারী। ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে চলমান যে
বিচার প্রক্রিয়া তাতে আইনের কোনো ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছেনা, বরঞ্চ মামলার ক্ষেত্রে আসামীর যে হাজিরা প্রক্রিয়া সেখান থেকেও ড. ইউনুসকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার সামাজিক অবস্থান, বয়স সব বিচার বিবেচনায় তাকে সর্বাধিক সুযোগ সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। শ্রম আদালতে বিচারাধীন বর্তমান বিচারিক মামলার অভিযোগকারীরা গ্রামীণ টেলিকমের কর্মী। এখানে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। শ্রমিকরাই মামলা করেছে এবং এই মামলা নিয়ে তারা কী করতে চায়, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার তাদের। দ্বিতীয় শ্রম মামলাটি শ্রম আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের জন্য শ্রম বিভাগ থেকে করা হয়। অভিযোগগুলো সঠিক নয় এমন কোনো প্রমাণ প্রফেসর ইউনূসের পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। যা দাবি করা হয়েছে তা হলো ‘ব্যতিক্রমবাদ’। ব্যতিক্রম ঘটনা থেকেই একটি আইনের শাসনের দিকে এগিয় যায়। এদেশে কখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার নজির ছিলোনা, তারমানে কি শুরু করারও সুযোগ নেই। শ্রমআইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ার নজির কম থাকলেও এই প্রক্রিয়াকে শুরু করাকে সাধুবাদ জানাই।
ডঃ ইউনুসকে নিয়ে প্রথিতযশা ব্যক্তিদের উষ্মা ও উৎকণ্ঠা প্রকাশের পিছনে বিশেষ কোন কারণ আছে কিনা তা এখন স্পষ্ট না হলেও তাদের এই উষ্মা অনেকটা ‘পিক আপ এন্ড চুজ’ ধাচের মত মনে হচ্ছে। কেননা একই সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জেলেবন্দি রয়েছেন। কথিত আছে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পিছনে মার্কিন শক্তি বড় ভূমিকা পালন করেছে। সেই কারণে নিজ দেশে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা পূর্বের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও মার্কিন প্রভাব বলয়ের বাইরে বের হউয়ার চেষ্টা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার মসনদ থেকে তাকে সরাসরি যেতে হয়েছে জেল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জেলখানাতেও তাকে ন্যূনতম মর্যাদা দেওয়া হচ্ছেনা বলে বার বার তিনি অভিযোগ করছেন। ইমরান খানের ব্যাপারে কোন বিশ্বনেতার উষ্মা বা উৎকণ্ঠা প্রকাশের নজির এখনো দেখা যাইনি। এখানেই ‘চুজ এন্ড পিক আপ’ এর বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। পাকিস্তানের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকারি পদে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং এর ফলে এ সময়কালে তিনি আর নির্বাচন করতে পারবেন না। প্রসঙ্গত, গত বছরের এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরান খান আগাম নির্বাচনের দাবি তুলে আন্দোলন করে যাচ্ছিলেন । তিনি সরকার এবং পাকিস্তানের খুবই ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রাখেন এবং তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করেন। গত বছরের নভেম্বরে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নেয়ার সময় ইমরান খানের প্রাণনাশের চেষ্টার সময় তার পায়ে গুলি লাগে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে হলেও, ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে। ইমরান খান সত্যি দোষী থাকলে অবশ্যই তার বিচার হউয়া উচিত, তবে এই প্রশ্নও থেকে যাই তার ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কোন উদ্বেগ না থাকার পিছনে কি কোন কারণ রয়েছে। মার্কিন প্রভাব বলয়ের বাইরে দেশকে পরিচালনা করতে চাওয়াটাই কি তাহলে তার ব্যাপারে এরূপ উদাসীনতা ও অনাগ্রহের কারণ। আমি ইমরান খানের পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না, তবে মার্কিন আস্থাভাজন হলে তার ব্যাপারে এক নীতি, আর বিরাগভাজন হলে তার ব্যাপারে আরেক নীতি, এই মনোভাবের বিপক্ষে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এই বিষয়টির সাথে ডঃ ইউনুসের পক্ষে বিবৃতি প্রদানের এক
অদ্ভুত মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির প্রভাব সমুন্নত রাখতে ইউনুসই যে তাদের সবচেয়ে আস্থাভাজন ব্যক্তি তা প্রতীয়মান হল। তা না হলে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এতজন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব একসাথে বিবৃতি দেবে কেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৪ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করে থাকে। ফলে অযাচিতভাবে বিচারাধীন মামলার বিষয়ে এ ধরনের বিবৃতি বা চিঠি দেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের ওপর অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ। যা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের বিবৃতি আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও) এবং বাংলাদেশের আইনে শ্রমিকদের প্রদত্ত অধিকার সংক্রান্ত বিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আবার একই চিঠিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা স্বাধীন, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। এ ধরনের বিবৃতির পেছনে গোপন ও দুরভিসন্ধিমূলক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। এছাড়া যারা বিবৃতি দিয়েছেন তাদের কাউকে ইমরান খানের ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি। এ ধরণের দ্বিচারিতা এটাই প্রতীয়মান করে পশ্চিমা প্রভাব বলয়ের মধ্যে থাকলে তার সাত খুনও মাফ, অন্যথায় বিনা বিচারে হত্যার শিকার হলেও সমবেদনা জানানোর মত কেউ থাকবেনা। ড. ইউনূস বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কতটুকু ছিলেন সেই বিচারের দায়িত্ব জনগণের, তিনি তার ব্যক্তি স্বার্থের জন্য ব্যবসা করেছেন, না জনকল্যাণের জন্য করেছেন তাও জনগণই বিচার করবে। তবে কেউ কোনোকিছুর জন্য সম্মানিত হলে তার বিরুদ্ধে যে বিচার কার্যক্রম চলবে না— এমন কোনো কথা নেই। তিনিও বিচার
ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নন, তার জীবদ্দশায় তিনি এ দেশের মানুষকে ঠকিয়ে থাকলে, সংক্ষুব্ধ শ্রমিক-গ্রাহকরা তার বিরুদ্ধে মামলা করতেই পারে এবং সেই মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হবে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে সাঁজা তাকে ভোগ করতেই হবে। এখানে সরকারে হস্তক্ষেপও যেমন কাম্য নয় ঠিক তেমনি বৈদেশিক মহলের বিচার কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া স্বাধীন বিচারবিভাগের জন্যও চরম অপমানজনক। বিবৃতিদাতাদের যদি এতই সন্দেহ থাকে তাহলে তাদের প্রতি আহ্বান রইল প্রত্যক্ষভাবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার জন্য। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত শক্তিবলয়ের অসম্পূর্ণ তথ্য দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে এ দেশের বিচার বিভাগের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ মনোভাব ব্যক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশবাসীকেও বলতে চাই, পশ্চিমা প্রভাব বলয়ের এই বিবৃতি যে দেশ-কাল-পাত্রভেদে ভিন্নরকম হয় তা বার বার প্রতীয়মান হয়েছে।