“আইএসআই’র সাথে বিএনপির গোপন ফোনালাপ ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি”
০২ আগস্ট, ২০২৩, 5:11 PM
NL24 News
০২ আগস্ট, ২০২৩, 5:11 PM
“আইএসআই’র সাথে বিএনপির গোপন ফোনালাপ ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি”
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের তাজা প্রাণ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আজকের এই বাংলাদেশ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদক্ষ নেতৃত্বে এবং দিক-নির্দেশনায় বাঙালি জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে আজকের এই বাংলাদেশ নির্মাণ করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি দলে দলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিজেদের জীবন বাজি রেখে দিয়ে গেছেন বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে খালি হয়েছে লক্ষ লক্ষ মায়ের কোল এবং ঝরেছে অনেক মায়ের চোখের পানি। বাঙালি জাতিকে স্বাধীন করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেটেছেন দীর্ঘ ১৪ বছর জেল এবং বিসর্জন দিয়েছেন জীবনের সকল সুখ-শান্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এতো এতো ত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মবিসর্জনেই বাঙালি জাতির সফলতার ইতিহাস রয়েছে।
আমাদের দূর্ভাগ্য এই যে বাঙালি জাতির এক অংশের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি স্বাধীন হওয়ার পর অন্য এক অংশের ষড়যন্ত্রের ফলে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বাঙালি জাতি এখনো ভোগ করতে পারেনি। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন একটি রাজনৈতিক দল যেটা জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত আঁতাত এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতির উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ষড়যন্ত্র করে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে উৎপত্তি হয় এই বিএনপি নামক দলটির। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের একজন জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান বানানোর যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরা দেখেছিলেন তার এজেন্ডা বাস্তবায়নেই পরবর্তীতে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি। যেমন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় তেমনি ষড়যন্ত্রকে ভিত্তি করেই বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া এই দলের কর্মকান্ড চালিয়ে আসছেন যুগের পর যুগ।
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল যে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের নিবিড় যোগাযোগ ছিলো। সৌদি আরবের জেদ্দায় ২০২২ সালের ৪ জুলাই তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীষর্স্থানীয় দুই কর্মকর্তার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুবাই বিএনপির এক নেতার মাধ্যমে তারেক রহমান আইএসআইয়ের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। যোগাযোগের এরকম আরও একাধিক মাধ্যম ছিলো বলে জানা গিয়েছিল।গত ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে আইএসআইয়ের পছন্দের প্রার্থীদের একটি তালিকা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল দুবাইয়ের ওই বিএনপি নেতার মাধ্যমে।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছিল, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আইএসআই কানেকশনের অভিযোগ অনেক পুরনো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের মেয়াদকালে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন দাউদ ইব্রাহীমের সঙ্গে তার বৈঠকেরও অভিযোগ ছিলো। ২০১৮ সালে আইএসআই এর সাথে যোগাযোগ প্রমাণ করে যে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা তার পুরনো যোগাযোগগুলো থেকে মোটেও সরে আসেননি। দুবাইতে বিএনপির যে নেতা আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, তিনি বিএনপির সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি জাকির হোসেন। আইএসআইয়ের যে এজেন্টের সঙ্গে তার নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার নাম শহীদ মেহমুদ। ছয় মাসের মধ্যে তখন দুবাইতে এ দুজন বিভিন্ন হোটেলকক্ষে অন্তত ১১ বার দেখা করেছেন বলে নথিপত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গিয়েছিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ এবং উপমহাদেশে সক্রিয় মৌলবাদী ও জঙ্গি নেতাদের ঘনিষ্ট ও নিয়মিত যোগাযোগে উদ্বিগ্ন ছিল পুরো দক্ষিণ এশিয়া। দক্ষিণ এশিয়া তথা পুরো এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হচ্ছে এই ‘আইএসআই’। বাংলাদেশের নির্বাচনের ক্ষেত্রে বরাবরই পাকিস্তানের আইএসআই বিএনপি’র সাথে একটি বিশেষ সংযোগ রক্ষা করে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, অতীত ইতিহাস অন্তত তাই বলে।
সেই সময় ফাঁস হওয়া বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কথোপকথনের সেই মেহমুদের পুরো নাম শহীদ মেহমুদ মুহাম্মদ শরিফ। তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করা আইএসআই এজেন্ট। আইএসআইর কাছ থেকে তিনি মাসে তিন হাজার ডলার বেতন পেতেন। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির স্বীকৃতি হিসেবে তার বেতন বেড়ে মাসে চার হাজার ডলার করা হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে আইএসআইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন। শহীদ মেহমুদ আইএসআইর নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি মূলত জাভেদ মেহেদির সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন। শহীদ মেহমুদ তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুবাইয়ে বিএনপির সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি জাকির হোসেনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই জাকির হোসেনের মাধ্যমেই মেহমুদ লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
খন্দকার মোশাররফের সঙ্গে আইএসআইর বেতনভুক এজেন্ট শহীদ মেহমুদের ফাঁস হওয়া সেই অডিও কথোপকথন অনুসারে, বিএনপির এই নেতা বাংলাদেশে তাদের দলের কর্মকান্ডের জন্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি সহায়তা চেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখন ভীষণ সমস্যার মধ্যে আছি। এ বিপদ থেকে আপনারাই উদ্ধার করতে পারেন।’ কথোপকথনে খন্দকার মোশাররফ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চীনকে ম্যানেজ করার জন্য শহীদ মেহমুদকে অনুরোধও করছিলেন। প্রত্যুত্তরে শহীদ মেহমুদ আইএসআইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং এ ব্যাপারে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। খন্দকার মোশাররফ ঢাকায় আইএসআইর কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্টের সঙ্গেও দেখা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন এবং তার জবাবে মেহমুদ জানিয়েছিলেন, তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এজেন্ট বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। আর এ সূত্র ধরেই এক সপ্তাহের মধ্যে গ্লোরিয়া জিন্স ক্যাফে ও নান্দোসে আইএসআই এর সাথে দু’দফা মিটিং করিছেলেন বিএনপি নেতারা।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শুধু নয় বরং অতীতেও তারা এ কাজ ঘটিয়েছে এবং বর্তমানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ১৯৯১ সালে যখন খালেদা জিয়া প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর কাছ থেকে অর্থ নেয়ার মতো ঘটনা ঘটে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে ৫০ মিলিয়ন রুপী দেয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন আইএসআই প্রধান আসাদ দুররানি।পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের এক শুনানীতে এই কথা স্বীকার করেছিলেন এই সাবেক আইএসআই চীফ।ব্রিটেনের ডেইলি মেইলে এই তথ্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এসেছিল। এমনকি শুনানির সময় আসাদ দুররানি এও স্বীকার করেন যে ঐ নির্বাচনে অর্থ প্রদান ছিলো পাকিস্তানের ফরেন পলিসির অন্তর্ভুক্ত। কেননা ভারতকে হুমকির মুখে রাখার জন্য বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে পাকিস্তানপন্থী হবার দরকার ছিলো, আর তাই পাকিস্তানের পুরাতন মিত্র বিএনপিকেই বেছে নেয় দেশটি এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সেই সুফলও পায় পাকিস্তান। প্রতিটি জায়গায় বিএনপি অহেতুক ভারত বিরোধীতার বীজ বপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ভারত বিরোধী অন্ধ প্রজন্মের জন্ম দেয়।
এছাড়াও বিএনপি’র সহায়তায় আইএসআই’র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২০০১- ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ২০টি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ক্যাম্প পরিচালিত হতো। আইএসআই এর আর্থিক সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় এই ক্যাম্পগুলো পরিচালিত হতো বলে ভারতের কাছে প্রমাণ ছিল। এমনকি ভারতের অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া থেকে শুরু করে সার্বিক ব্যবস্থাপনা তারেক জিয়া করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় এবং বিভিন্নভাবে দেশকে নিয়ে করা তারেক জিয়া এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের করা এসব ষড়যন্ত্র নিঃসন্দেহে ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ড। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা এমন ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাই।
ষড়যন্ত্র এবং অপরাজনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল বিএনপি জনসমর্থন এবং মাঠের রাজনীতিতে কোনোদিন সফল হতে পারবেনা ভেবেই পূর্বের ন্যায় রাজনীতির নতুন পথ ষড়যন্ত্রকেই তারা একমাত্র উপায় হিসেবে বেঁছে নিয়েছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে। কিন্তু এসব ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করতে পারবেনা। গণতন্ত্রে ও স্বাধীনতার শক্তিতে বিশ্বাসী আওয়ামিলীগের সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনসাধারণের সমর্থন নিয়ে পূর্বের ন্যায় বিএনপি সব ধরনের ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক অপতৎপরতাকে শক্ত হস্তে দমন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তারেক জিয়া এবং বিএনপির অন্যসব নেতাকর্মীদের ষড়যন্ত্র কোনভাবেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ করতে পারবেনা।