রংপুরে নৃশংসভাবে ৪ খুনের ঘটনায় বেড়িয়ে এল আঁতকে ওঠার মতো তথ্য
২৪ আগস্ট, ২০২৬, 11:17 AM
NL24 News
২৪ আগস্ট, ২০২৬, 11:17 AM
রংপুরে নৃশংসভাবে ৪ খুনের ঘটনায় বেড়িয়ে এল আঁতকে ওঠার মতো তথ্য
রংপুর মহানগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের তথ্য প্রকাশ করেছেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আদালতে হাজির করা হলে তারা মুখ্য মহানগর হাকিম মো. রফিকুল ইসলামের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আসামিরা দুজন সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাতেই তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তারা অপরাধ স্বীকার করায় আলাদা করে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয়নি।
তিনি আরও জানান, জবানবন্দিতে আসামিরা এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘটনার পেছনে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে সব অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নিজেদের বসতবাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের রক্তাত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ অভিযানে নেমে রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা তার মোবাইল ফোন থেকে ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে পূজা আবারও বড় বোন প্রীতিলতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন পরিবারের চারজনের মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়। এতে সন্দেহ হলে তিনি স্বামী বিপুল আচার্যকে নিয়ে রাতে বোনের বাড়িতে যান।
তারা গিয়ে বাড়িটিকে অন্ধকার দেখতে পান এবং ভেতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে পূজা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ঘরের ভেতরে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে পচা গন্ধও বের হচ্ছিল।
এজাহারে বলা হয়, বাড়ির আলমারি, শোকেস, আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এতে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বা অন্যভাবে উপস্থাপন করতে জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়েছে।
এদিকে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে ছাদে যান গণপতি। তাদের বাধা দিলে তাকে গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়েকে এবং সর্বশেষ ১২ বছরের শিশু প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিয়ম আসামিদের চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই ছিল দুজন। তারা গোসল করে, খেজুর খায় এবং ইয়াবা সেবন করে। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা বলে তদন্তকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করে।
পুলিশ জানায়, ঘরে পাওয়া একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার আলামত থেকেই তদন্তে নতুন সূত্র মেলে। পরে সিদ্ধার্থের স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আসে। লুট করা স্বর্ণালংকার তাদের দেখানো মতে একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাড়ির দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, আলামত নষ্ট করতেই এমনটি করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি ও কামড় দেওয়া শসাও উদ্ধার করা হয়েছে। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।