ঢাকা ২৪ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে ব্রাজিলের সামনে যে সমীকরণ হত্যাচেষ্টা মামলায় কণ্ঠশিল্পী মমতাজ গ্রেপ্তার তারেক রহমানের সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ গ্রেপ্তারের একদিন পর কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘টাইগার সোহেল’ গ্রেপ্তার দেশে স্বর্ণের দামে বড় ধস যে কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম শিক্ষার্থী নকল করলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: শিক্ষামন্ত্রী চীনের দালিয়ান থেকে বেইজিংয়ের পথে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট

যে কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম

#

২৪ জুন, ২০২৬,  1:19 PM

news image

দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগের পরও হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু প্রত্যাশিত হারে কমছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক এই রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলেও কভারেজের ঘাটতি, টিকা নিয়ে অভিভাবকদের দ্বিধা, মাঠপর্যায়ে নজরদারির দুর্বলতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন কিছু প্রশ্ন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এমনকি টিকার পূর্ণ ডোজ নেওয়া শিশুদের মধ্যেও প্রত্যাশিত মাত্রায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে দেশে হামের দীর্ঘস্থায়ী প্রকোপের নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা ক্যাম্পেইন এবং বিভিন্ন উদ্যোগের পরও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার মূল কারণ টিকাদানে ঘাটতি (বিশেষ করে নির্দিষ্ট এলাকায় ৯৫ শতাংশ কভারেজ না পাওয়া), অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং হাম ভাইরাসের অত্যন্ত সংক্রামক চরিত্র। তারা বলছেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগগুলোর একটি। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে টিকা না নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই সংক্রমিত হতে পারে। পর্যাপ্ত কভারেজ নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক এলাকায় (পকেট) শিশুরা টিকাদানের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করছে। অনেক অভিভাবক নির্দিষ্ট বয়সের আগে বা পরে টিকা দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। এ ছাড়া রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে যথাযথ সচেতনতা, আইসোলেশন ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।


রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, টিকাদানের মাধ্যমে হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার কথা। কিন্তু চার সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও রোগটির সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কেন আসছে না, সে বিষয়টি জানার জন্য গবেষণা করতে হবে। অন্যথায় এই সমস্যার সামাধান জটিল হয়ে উঠবে।


সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বলেন, হামের প্রকোপ না কমার বিষয়টির কারণ অনুসন্ধানে তারা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, সঠিকভাবে টিকার ডোজপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে হামের প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ টিকা সবার শরীরে সমানভাবে কার্যকর নয়।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামের টিকা ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৫৯ মিলিয়ন মৃত্যু রোধ করেছে। একটি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী টিকা সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ সালে হামে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৫ হাজার মৃত্যু হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী টিকা না নেওয়া বা আংশিক টিকা নেওয়া শিশুরা। ১৯৬৩ সালে হামের টিকা চালু হওয়া এবং ব্যাপক টিকাকরণের আগে প্রায় প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর বড় ধরনের মহামারি দেখা দিত এবং এর ফলে প্রতি বছর আনুমানিক ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো। টিকাদানের ফলে ২০০০ সালে হামে আনুমানিক মৃত্যু ৭ লাখ ৮০ হাজার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৯৫ হাজারে দাঁড়ায়।


বাংলাদেশে হামের প্রকোপ প্রসঙ্গে ইউনিসেফ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামের বিস্তার বাড়ছে। কারণ পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকা পায়নি। ফলস্বরূপ, প্রায় ১ কোটি শিশু (এমআর১-এর জন্য) এবং ২ কোটি শিশু (এমআর২-এর জন্য) হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিগত কয়েক বছরে জমে থাকা এই ক্রমবর্ধমান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিই হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে সাম্প্রতিককালে অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে, টিকা সম্পর্কে ভুল তথ্য কিছু অভিভাবককে আরও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলেছে, যার ফলে টিকাদানের হার কমে গেছে এবং হামের বিস্তার দ্রুততর হয়েছে। ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে উচ্চ টিকাদান হার থাকার ইতিহাস থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোটখাটো ব্যাঘাতও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ঘাটতি তৈরি করতে পারে। বর্তমানের মতো প্রাদুর্ভাবগুলো সাধারণত কোনো একটি একক কারণের পরিবর্তে এই পুঞ্জীভূত ঘাটতিগুলোরই ফল।


বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী বলেন, রোগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা ঘটাতে না পারলে হাম বা ডেঙ্গুর মতো রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।


তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে আমরা জেনেছি। আশা করছি আর বেশিদিন থাকবে না।


এদিকে দেশে হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জনের এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ৫৯৩ জনের মৃত্যু হলো। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১ হাজার ১৩৫ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞিপ্ততে এসব তথ্য জানানো হয়।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা, মৌলভীবাজার ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ২৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৮৮, সিলেটে ৭৫, চট্টগ্রামে ৫০, বরিশালে ৩৯, ময়মনসিংহে ৫৫, খুলনায় ২৭ এবং রংপুরে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।


এদিকে দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৬ জনের। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১০০৯ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত মোট ৯৪ হাজার ৭৬৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে ১১ হাজার ২৯৭ জনের হাম শনাক্ত হয়।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৮ হাজার ৭১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৭৪ হাজার ৯৭১ জন ছাড়পত্র পেয়েছে। 

সূত্র : দৈনিক কালবেলা

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম