ঢাকা ০২ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৩৪ রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের ইঙ্গিত শিক্ষামন্ত্রীর স্মার্ট কার্ডধারী কৃষকরা ঋণে অগ্রাধিকার পাবেন দেশে ফিরেছেন ১৭ হাজারের বেশি বাংলাদেশি হাজি ছয় অতিরিক্ত সচিবসহ ৮ কর্মকর্তাকে বদলি মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ ভালো নেই: জামায়াত আমির কর্মীদের কষ্টের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় নয়: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাতুড়ি দিয়ে দরজা ভেঙে সোহেলের ঘরে প্রবেশ করি: রামিসার বাবা

মন্দায় আক্রান্ত শিল্প

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জুন, ২০২৬,  10:51 AM

news image

দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত সংকটে নিমজ্জিত। মন্দায় আক্রান্ত শিল্পে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি তাই ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, উচ্চ সুদহার, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি—এই চতুর্মুখী আক্রমণে নাস্তানাবুদ বেসরকারি খাত। আসন্ন জাতীয় বাজেট ঘিরে ব্যবসায়ীদের একমাত্র প্রত্যাশা, সরকার যেন বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে। এটি ২০০৩ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত তথ্য অনুসারে ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এর আগের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। মূলত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। তবে নতুন ঋণের চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে।

ব্যাংকগুলো নিরাপদ আয়ের আশায় সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি বিনিয়োগ করছে। উচ্চ ঋণ সুদ, জ্বালানির সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট বৈদেশিক চাপ—এসবই ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার বড় কারণ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও।  বেকারত্ব বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতি দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত।

তাঁরা বলছেন, খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি ব্যবসায়ীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে আরো সতর্ক হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় এই স্থবিরতা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি খাত। এই খাত যদি রুগ্ণ হয়ে পড়ে কিংবা মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। সরকারের মূল দায়িত্বই হলো বেসরকারি খাত যাতে অর্থনীতিতে পূর্ণ অবদান রাখতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব আবহাওয়া তৈরি করা এবং পথের সব বাধা দূর করা।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রতিনিয়ত তাঁদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বিগত সরকারের কাছে নানা দাবি জানিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত সেগুলোর কার্যকর কোনো সুরাহা মেলেনি। আসন্ন বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করার জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ থাকতে হবে। স্থবির হয়ে পড়া উন্নয়নের চাকা আবার সচল করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। আর সে জন্য যে সমস্যাগুলো এই খাতকে টেনে ধরছে, নতুন বাজেটে তা দূর করার স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।’

কেন মন্দায় আক্রান্ত শিল্প খাত : শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের শিল্প খাতে পাঁচ বছর ধরে চলা টানা মন্দার নেপথ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের তীব্র তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) ঘাটতি এবং কাঁচামাল আমদানির জটিলতা। ২০২০ সালের মার্চে করোনা সংক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২২ সালে শুরু হয় বৈশ্বিক মন্দা, যা পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতায় আরো তীব্র রূপ নেয়। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফলে ডলারের উচ্চমূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে, যা শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। সময়মতো কাঁচামাল আনতে না পারায় এবং জ্বালানির সংকটে অনেক উদ্যোক্তা তাঁদের উৎপাদনক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার এই প্রবণতা দেশে নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণকে পুরোপুরি থমকে দিয়েছে।

ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ও আর্থিক খাতের অনিয়মের কারণে ব্যাংকগুলোতে যে চরম তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, তার ফলে একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ঋণের সুদের হারও অনেক বেড়ে গেছে। এই উচ্চ সুদের হারের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানার উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বাজারে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়া সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক বিক্রিতে। সার্বিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে এবং এই বহুমুখী সংকটের বৃত্তে আটকে থেকেই দেশের শিল্প খাত এখন এক ভঙ্গুর ও তীব্র মন্দা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

উচ্চ সুদহারে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয় : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় প্রতিযোগী দেশের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেড় বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখেছে। গভর্নর স্পষ্ট জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত এই সংকোচনমূলক নীতি বজায় থাকবে। এর প্রভাবে ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ লাভজনক নয় বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

জ্বালানিসংকটে কারখানা বন্ধ : দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর যুদ্ধ ঘিরে অস্থিরতা বাড়ায় জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানির সংকট নিরসন না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ ফেরানো কঠিন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

নতুন বিনিয়োগে মন্দা, কমেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি : দেশের শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান অনুষঙ্গ ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি’ (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১০.৪৩ শতাংশ। সামগ্রিক আমদানি প্রবণতায়ও নিম্নমুখী ধারা লক্ষ করা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫২.৬১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৪.১৪ শতাংশ।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার এই ধারাবাহিক প্রবণতাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের জন্য একটি বড় ধরনের নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রণোদনা প্যাকেজ ও সম্ভাবনার আলো : বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু হবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, সরবরাহ সংকট ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো না গেলে এই প্রণোদনা উল্টো মূল্যস্ফীতি আরো বাড়াতে পারে।

সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানো ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিতে পারে। ব্যবসায়ীরা চান, নতুন করে করের বোঝা না বাড়িয়ে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ ও ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো হোক।

আসন্ন বাজেটে করণীয় ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা : আসন্ন বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘিরে ব্যবসায়ীরা নানা প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা বলছেন, বাজেটে ব্যাবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা জরুরি। তাঁরা চান সুদের হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, করের হয়রানি ও বোঝা কমানো, ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করা, এসএমই খাতের জন্য বিশেষ তহবিল, রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি, বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুতি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যৌথভাবে ব্যাবসায়িক ব্যয় কমানো ও শুল্ককাঠামো আধুনিকায়নের জোর দাবি জানিয়েছে। এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই ও এফআইসিসিআই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে দেওয়া প্রস্তাবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে উৎপাদন পর্যায়ে অগ্রিম কর (এটিআই) ও অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়াকে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’-এর আওতায় সহজীকরণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনগুলো। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে করপোরেট করের হার যৌক্তিকীকরণ এবং তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির কর হারের ব্যবধান কমানোর ওপর জোর দিয়েছে বহুজাতিক চেম্বার এফআইসিসিআই ও এমসিসিআই।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার তাগিদ দিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানির চড়া মূল্য, ডলারের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট অভ্যন্তরীণ শিল্প উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বেসরকারি খাতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করার দিকে মোড় নিতে হবে। বেসরকারি ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের নিম্নমুখী অবস্থান থেকে টেনে তুলতে সরকারকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঘাটতি অর্থায়ন কমিয়ে আনতে হবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার ধারা রুখবে। প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে রাষ্ট্রের সম্পদ প্রশাসনিক ব্যয় থেকে সরিয়ে এনে সরাসরি উচ্চ গুণিতক (হাই-মাল্টিপ্লায়ার) সরকারি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

বিদ্যমান করপোরেট করদাতাদের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানোর আগ্রাসি প্রবণতা বন্ধ করে করের আওতা (ট্যাক্স নেট) সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়ে আশরাফ আহমেদ বলেন, ‌‘কার্যকর করের হার না বাড়িয়ে করের ভিত্তি বড় করাই রাজস্ব স্থায়িত্ব অর্জনের একমাত্র যৌক্তিক পথ।’

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘দেশীয় উৎপাদন কমছে, অনেক কারখানা সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের একটি অংশ বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এতে শুধু শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি পুরনো শিল্পকে শক্তিশালী করতে সহজ ও কার্যকর অর্থায়ন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাংক খাত নিজেই এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক শিল্পে নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী। সব মিলিয়ে এবারের বাজেট শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি হওয়া উচিত শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার বাস্তব পরিকল্পনা। বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।’

সূত্র  : কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম