বিএনপি: জনসম্পৃক্ত নাকি জনবিচ্ছিন্ন
১২ এপ্রিল, ২০২৩, 3:59 PM
NL24 News
১২ এপ্রিল, ২০২৩, 3:59 PM
বিএনপি: জনসম্পৃক্ত নাকি জনবিচ্ছিন্ন
|| অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া ||
বিএনপি যে জনবিচ্ছিন্ন এটা সহজেই অনুমেয়। তাদের অপরাজনীতিই এর জন্য দায়ী। মানুষ জানে, কয়লা ধুলেও ময়লা যায়না। তাই বিএনপি এখন যতই সংস্কারের কথা বলে রূপকল্প ঘোষণা করেনা কেন মানুষ বিএনপিকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণ সব দলের একটি রাজনৈতিক অধিকার। এটি কোনো সুযোগ নয়, এটি একটি অধিকার। কিন্তু বিএনপি পরাজয়ের ভীতিতে আক্রান্ত, তাই তারা নির্বাচনে আসে না। কমিশনকে তারা বিতর্কিত করতে চায় এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যমূলক অপতৎপরতা চালায়। তাদের সময় কমিশন গঠনে তারা কি কারও মতামত নিয়েছিল? কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছিল? তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সাদেক আলী ও আজিজ মার্কা অজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল। সোয়া এক কোটি ভুয়া ভোটার তালিকাবদ্ধ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করেছিল বিএনপি। দলীয় ক্যাডারদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিয়েছিল। দেশের জনগণ কি এসব ভুলে গেছে?
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। অল্পের জন্য ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী। এ হামলা পরিকল্পনার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানকেই দায়ী করা হয়। তারেক রহমান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। বর্তমানে তার সাজা স্থগিত হওয়ায় তিনি গুলশানে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। তবে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকা-ে প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। তার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে যুক্তরাজ্য থেকেই বিএনপির কর্মকা- পরিচালনা করছেন তারেক রহমান। এভাবে জনসংযোগ হয়না, বরং জনসাধারণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়।যার বাস্তব প্রমাণ বিএনপির বর্তমান অবস্থা।
এছাড়াও বিএনপি আন্দোলনের কথা বললেও আগামী দিনে ক্ষমতায় এলে জনগণের জন্য কী করতে চান সে বিষয়ে কোনো রূপরেখা নেই কেন? ফলে আন্দোলনে সাধারণের সম্পৃক্ততা ঘটার বিষয়েও সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে অনেকেরই একটাই মত যে এসব কারণেই সাধারণের কোনো সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ বর্তমান পরিস্থিতিতে নেই। তাছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীরা বুঝতে পেরেছেন যে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গিয়ে তারা নিজেরাই বেকায়দায় পড়ে গেছেন।
২০০৬ সাল থেকে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল বিএনপি গত ১৮ বছরে একটি আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে জনগণ তাদের সঙ্গে ছিল। ফলে প্রতিটি আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত হানাহানি ও সহিংসতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলটির শীর্ষ নেতারা দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, পুড়িয়ে হত্যা ইত্যাদির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হলে আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিএনপি। ফলে গত ৪ বছরে বিএনপির কর্মসূচি কেবল বিবৃতি-সেমিনারেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিশ্লেষক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আবারও পরিস্থিতি উতপ্ত করার চেষ্টা করছে দলটি। এ জন্য ঢাকায় বিদেশি মিশনের রাষ্ট্রদূতদের কাছেও বার বার ধরনা দিতে দেখা গেছে তাদের। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কূটনীতিকদের বিভ্রান্ত করতে সফলও হয়েছে তারা। আর এতেই আন্দোলনের নামে নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরিতে উৎসাহ পেয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে সাম্প্রতিক বছর গুলোতে রাজনীতির মাঠে বিভিন্ন রকমের চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এসব সমস্যা কিংবা চ্যালেঞ্জের প্রায় সবগুলোই বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে চরিত্র ধারণ করে তার বহিঃপ্রকাশ। ফলে বিএনপি গত ১৫ বছরে একটি জনবিচ্ছিন্ন ও জনকল্যাণবিমুখী ক্লাবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে জনগণের কাছে তাদের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে যা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিষয়গুলো বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তিকে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলেছে। আর এ দুর্বল রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বিএনপির ভবিষ্যত রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করছে।
কোভিড-১৯ মহামারীতে বিএনপির ভূমিকাও সমালোচিত হয়েছে। দলটির বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানো এবং মহামারীর তীব্রতা বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি নেতাদেরও স্বাস্থ্য প্রোটোকল লঙ্ঘন করতে দেখা গেছে, যেমন মাস্ক না পরা, বড় সমাবেশে অংশ নেওয়া ইত্যাদি। এসব কর্মকা- মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে এবং একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে কোভিড-১৯ এর মতো সংকটময় মুহূর্তে শ্রমজীবী ও নি¤œ আয়ের মানুষের পাশে দাড়িছে সেখানে বিএনপি সরকারের সমালোচনায় তাদের সময়কে পার করেছে। কোভিড এর সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের ভূমিকা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। তারা জরুরি খাদ্য সহায়তা কিংবা ওষুধ সহায়তা নিয়ে মানুষের পাশে দাড়িয়েছে। এ সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মূখ্য ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। অনেক ছাত্রলীগ নেতা নিজ উদ্যোগে সংকটাপন্ন কোভিড রোগীকে অক্সিজেন সেবা দিয়েছে। এ ব্যাপারে 'জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা' এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলো আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সহায়তা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি কার্যক্রম তাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয়ই বহন করে। তারা এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বিষয়গুলো সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি মূখ্য উপকরণ মনে করে। গত বছর (২০২২ সাল) সিলেটের বন্যায় বিএনপির ভূমিকা এমনই একটি অদূরদর্শিতার উদাহরণ। দলটির বিরুদ্ধে এ দুর্যোগকেও রাজনীতিকরণের অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে বিএনপিকে লোক দেখানো ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্থদের প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেছে। তবে এই কাজগুলি বিএনপির রাজনীতি হীনতার বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের কর্মকা- দলটির রাজনীতির মাঠকে আরও দুর্বল করেছে। সামগ্রিক ঘটনার দরুন বিএনপির প্রতি জনসাধারণের আস্থা হারিয়ে গেছে এবং বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
ট্রেজারার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
ও
সাবেক চেয়ারম্যান
ট্যুরিজম অ্যান্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।