ঢাকা ১৮ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
রাত ১টার মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে যেসব অঞ্চলে কোনো ভদ্রলোক আওয়ামী লীগ করে না: বিদ্যুৎমন্ত্রী নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদ একসঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে: প্রেস সচিব হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি রাজধানীতে যানবাহনের হর্ন নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে কৃষি কর্মকর্তা নিহত আমাদের বাণিজ্য পরিপূর্ণভাবে চীন নির্ভর হয়ে পড়েছে: তথ্যমন্ত্রী পাকিস্তানের সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু বাংলাদেশকে বাণিজ্যযুদ্ধে সঙ্গে রাখতে চায় চীন: মির্জা ফখরুল আজ থেকে শুরু হচ্ছে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম

পাকিস্তানের সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু

#

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৮ জুলাই, ২০২৬,  2:52 PM

news image

পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনায় অন্তত ১৩০ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, সিন্ধ এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল এবং আশপাশের এলাকায় ১০ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া করাচির লান্ধি এলাকায় সেসির আরেকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৃথক পরীক্ষায় আরও ১০ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

সেসি সিন্ধু প্রদেশের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

করাচির সাইট টাউন এলাকায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে কেবিভি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একাধিক শিশুর এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। তবে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংক্রমণের সূত্রপাত আরও আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন প্রথম ছয়জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর তথ্য সিন্ধুর স্বাস্থ্য বিভাগে আসে।

গত ১৪ জুলাই সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল জানানো হয়। এতে হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, সংক্রমণ প্রতিরোধের নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার ছিল অপর্যাপ্ত এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুতর অনিয়ম ছিল।

প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া ১৬ শিশুর এইচআইভি সংক্রমণের তথ্য উঠে আসে। পরে ১৯ জুন জমা দেওয়া দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮ এবং মৃতের সংখ্যা ছয়জন বলে নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১৩০ জনে পৌঁছে।

তদন্তে প্রশাসনিক ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৭ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি নিজের পরোক্ষ দায় স্বীকার করেছেন এবং প্রয়োজনে পদত্যাগ করতেও আপত্তি নেই।

সংক্রমণের কারণ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। সিন্ধু হাইকোর্টে দায়ের করা এক রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের কারণেই এইচআইভি ছড়িয়েছে।

তবে শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনির দাবি, কেবিভি হাসপাতালে অটো-ডিজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়, যা একবার ব্যবহারের পর পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যদিও সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু সিরিঞ্জ নয়, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে সিন্ধু হাইকোর্টে করা আবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণ ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৪৮ হাজারে পৌঁছেছে।

বর্তমানে পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই জানেন না যে তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত।

বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ডব্লিউএইচও ও ইউএনএইডস জানায়, ২০১০ সালে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে যেখানে ৫৩০টি সংক্রমণ ছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০০-তে। অথচ এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছে। একইভাবে মা থেকে শিশুর সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন মাত্র ১৪ শতাংশ গর্ভবতী নারী।

চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এইচআইভি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানে অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতির কারণেই বারবার এইচআইভির প্রাদুর্ভাব ঘটছে। যদিও গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কত মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পর্যায়ের নজরদারি ব্যবস্থা নেই। 

চলমান সংকট মোকাবিলায় সিন্ধু হাইকোর্ট প্রাদেশিক সরকারকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশজুড়ে নিম্নমানের সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানের ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হবে।

এছাড়া অস্ত্রোপচারের আগে সারা দেশে বাধ্যতামূলক এইচআইভি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোস্তফা কামাল।

সিন্ধু সরকার আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপির একটি তহবিল গঠন, বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং কেবিভি হাসপাতালের ক্রয় ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার স্বাধীন নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের কঠোর তদারকি, নিরাপদ চিকিৎসাচর্চা নিশ্চিত করা এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ইনজেকশন ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে। 

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম