ঢাকা ২২ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
চাঁদাবাজির অভিযোগ: মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে দেওয়া হলো এমপিপুত্রকে সাবেক এমপি আনার হত্যা মামলার আসামি শিমুলের জামিন স্থগিত ১৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য আরব আমিরাতে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দেশে স্বর্ণের দামে বড় লাফ ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১ শিশুর মৃত্যু বিশ্বে জ্বালানি উদ্বেগ বাড়লেও তেলের মজুতে স্বস্তিতে চীন নতুন মাদকের নীরব বিস্তার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নিশ্চিন্তে জিতবে আর্জেন্টিনা, বলছে অপ্টা ইসরায়েলের যে কোনও হামলার জবাব দেওয়া হবে: হিজবুল্লাহ

নতুন মাদকের নীরব বিস্তার

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ জুন, ২০২৬,  11:14 AM

news image

সময়ের তালে অনেক কিছুর মতো মাদকেরও রূপ, রং ও আদল পাল্টেছে। তবে দেশে প্রচলিত মাদক বলতে বোঝায় হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা কিংবা ইয়াবা। সময়ের চাহিদায় এসব মাদকেও এসেছে পরিবর্তন। ফলে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে অনেকটা নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্মের বিচিত্র সব মাদক। এসব মাদকের মধ্যে নতুন প্রজন্মের কাছে বেশি পরিচিত সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক।


নতুন এই মাদকের গড়ন-গঠনও পাল্টে হয়েছে এমডিএমবি, আইস, খাথ, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ, ট্যাপেন্টাডল, ট্রামাডল এবং কিটামিন। নতুন প্রজন্মের মাদক অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ২০১৮ সালের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক ডজনের বেশি নতুন প্রজন্মের মাদকের সন্ধান পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।


বিশেষজ্ঞ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণদের বড় একটি অংশের মধ্যে নতুন এই মাদকের ব্যবহার বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মাদকগুলো অনেকটা নিভৃতে প্রবেশ করছে দেশের অভ্যন্তরে। আবার নিভৃতেই নতুন প্রজন্মের মাদক দেশের অভ্যন্তরে বাজারও তৈরি করে নিয়েছে। নতুন প্রজন্মের এই মাদকের অন্তত ৯০ শতাংশ অনলাইনে বেচাকেনা ও টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে সরকার এরই মধ্যে ডিজিটাল (অনলাইন) মাধ্যমে পরিচালিত নতুন প্রজন্মের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে মাদক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।


নতুন প্রজন্মের মাদকের পাশাপাশি পুরনো মাদকের বিস্তারও থেমে নেই। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন ও ফেনসিডিল জব্দের তালিকাই বলে দিচ্ছে এসব মাদকের বিস্তারও আতঙ্কজনক। গত বছর গড়ে যেখানে প্রতি মাসে ৩৬ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে ৪০ লাখের বেশি ইায়াবা জব্দ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ ছাড়া গত বছর ১৬৬ কেজি হেরোইন উদ্ধার হলেও চলতি বছর প্রথম তিন মাসে ৬১ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। গত বছর ১৪ কেজি ৬০০ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করা হলেও চলতি বছর প্রথম তিন মাসে ১৬ কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়েছে।


এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন, গাঁজাসহ প্রচলিত মাদকের প্রবণতাও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যত মাদক উদ্ধার হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি আইনের ফাঁকফোকর এড়িয়ে চলে যাচ্ছে সেবনকারীদের কাছে।


গত মার্চ মাসে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে চীনা তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। ওই ফ্ল্যাটের ভেতর পাওয়া যায় অস্থায়ী একটি ল্যাবরেটরি। যেখানে তরল কিটামিনকে পাউডারে পরিণত করে ব্লুটুথ স্পিকার ও সাউন্ড ইকুইপমেন্টের ভেতরে ঢুকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল।


সেখান থেকে ছয় কেজি কিটামিন, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেজিং মেশিন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে ব্যবহৃত একটি পেনড্রাইভ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের মাদকে এভাবে রূপান্তর করে মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের মাদকের বেশির ভাগ ভোক্তা ধনিক শ্রেণির তরুণ প্রজন্ম। এসব মাদক ব্যয়বহুল হওয়ায় তাদের কাছে এটি বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।


নতুন প্রজন্মের মাদক দেশে আসছে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। পার্সেলে কিংবা যাত্রীবেশে মাদক কারবারিরা এসব মাদক বহন করে দেশে নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়টি অভিযান চালিয়ে এ ধরনের কয়েকজন কারবারিকে আটকও করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণ পেয়েছেন, এদের বড় একটি অংশ বিদেশি নাগরিক। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিসংখ্যানে নতুন মাদকের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ কম।


সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন প্রজন্মের মাদকের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছে, মাদকপাচারকারী চক্রগুলো এরই মধ্যে সীমান্তভিত্তিক কার্যক্রম ছাড়িয়ে এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ডার্ক ওয়েবের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করছে। এর জন্য সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে সরকার। এতে অনলাইন মাধ্যমে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কারণ বিদ্যমান আইনে এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলা করা কঠিন।


প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, পরিবহন বা বিতরণ করা ফৌজদারি অপরাধ। একই সঙ্গে মাদকপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনও অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।


ডিএনসির মতে, মাদকের বড় অংশ সীমান্ত পথ, কুরিয়ার সেবা, অথবা বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং অনলাইনভিত্তিক চক্রের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের মাদকের ‘মিনি ল্যাব’ বা ছোট কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে কিটামিনসহ কিছু সিনথেটিক মাদক প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল। বিদেশি নাগরিকদের একটি চক্রের যোগসাজশে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে কৃত্রিম মাদক বিদেশ থেকে দেশের ভেতরে প্রবেশের পাশাপাশি সহজে তৈরিও হচ্ছে। চক্রগুলো শুরুতে নতুন প্রজন্মের মাদক আইস, তারপর এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম এবং পরে এমডিএমবি বাজারজাত করতে শুরু করে।


মাদক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের মাদকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করা। যা ব্যবহারকারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম সহজে ব্যবহার করা যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের মাদকের বিস্তার সহজ হয়েছে।


অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী শুধু গ্রেপ্তারের সময় মামলাগুলো নথিবদ্ধ করছে। কিন্তু এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে যে সরবরাহ চেইন চলছে, সেগুলোর ওপর তদারকি করছে না।


ডিএনসির তথ্য বলছে, বর্তমানে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী তরুণদের মধ্যে  হেরোইনের মতো প্রচলিত মাদকের চেয়ে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই মাদক দেশে প্রবেশের তিনটি প্রধান মাধ্যম চিহ্নিত করা হয়েছে—আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিস (ইএমএস, সাধারণ কুরিয়ার), বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং আন্ত সীমান্ত চোরাচালান চক্র। সিনথেটিক মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বোঝা যাচ্ছে, এই রুটগুলো বেশ পোক্ত। নির্দিষ্ট চেকপয়েন্টে এগুলো আটকানো কঠিন।


ডিএনসির ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘তিন-চার বছর ধরে বেশ কিছু নতুন মাদক ধরা হয়েছে। এসব মাদকের প্রতি বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ বেশি। তারা এগুলো বাইরের দেশ থেকে ডার্কওয়েবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্ডার করে। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে অনলাইন ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপস। এ ধরনের কিছু মামলা তদন্ত করা হয়েছে। আমরা আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকার যদি কঠোর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকই হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইয়াবার মতোই এসব নতুন মাদক ভবিষ্যতে আরো বড় সামাজিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এসব মাদক নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে আদল পাল্টে সেবীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।’


মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ তরুণ-যুবক। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো নির্ভুল জরিপ নেই। তবু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।’


পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘মাদক কারবারি ও সেবীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। একই সঙ্গে নতুন মাদকের প্রতি কঠোর নজরদারি রেখে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’


সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম