ঢাকা ১০ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
বকেয়া পৌরকর আদায়ে ১৫% সারচার্জ মওকুফের সুযোগ দিলো ডিএসসিসি ডেঙ্গু চিকিৎসায় সব ধরনের সহায়তা করবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদালতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা দম্পতি বর্তমান সরকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করছে: শামা ওবায়েদ সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ-জামালপুর রেল যোগাযোগ বন্ধ নদীভাঙনে ছোট হয়ে আসছে বরিশাল দেশে স্বর্ণের দামে ফের পতন, ভরিতে কমলো কত আলভারেজকে নিয়ে রিয়াল-বার্সার লড়াই, ১৫০ মিলিয়নের মেগা অফার প্রত্যাখ্যান অ্যাতলেটিকোর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে স্মরণ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সম্মান ও স্বীকৃতির গল্প

নজরদারির ফাঁকেই চলছে ‘প্রেসক্রিপশন বাণিজ্য’

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ জুন, ২০২৬,  11:13 AM

news image

♦ অতিরিক্ত ওষুধে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমছে চিকিৎসায় আস্থা ♦ ‘ই-প্রেসক্রিপশন’ ও কেন্দ্রীয় ডেটা বেইস জরুরি ♦ সচেতন হতে হবে রোগীকেও ♦ মোট চিকিৎসা ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৬% ওষুধে

সামান্য পিঠব্যথা নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দেখিয়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ছিল ৯টি ওষুধ—দুই ধরনের ব্যথানাশক, দুটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, একটি অ্যান্টিবায়োটিক, দুটি ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট, একটি ঘুমের ওষুধ ও একটি পেশি শিথিলকারী।

তিনি চেম্বার থেকে বের হতেই প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে জোরাজুরি শুরু করেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধিরা। আমজাদ হোসেনের ছেলে আসিফ ইকবালের ভাষায়, ‘বাবার পিঠের ব্যথার জন্য ৯টি ওষুধ কেন লাগবে? তার ওপর অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে, অথচ জ্বর বা ইনফেকশন কিছুই নেই। চিকিৎসা নিতে এসেছি, নাকি কোনো ব্যবসার অংশ হয়েছি?’

এই দৃশ্য দেশের স্বাস্থ্য খাতের নিত্যদিনের বাস্তবতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, আইনের ফাঁক, দুর্বল নজরদারি ও ওষুধ কোম্পানির অনৈতিক বিপণন কৌশলে সাধারণ রোগীরা পিষ্ট হচ্ছেন ‘প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের’ জাঁতাকলে। অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি, একই সঙ্গে কমছে চিকিৎসকদের ওপর মানুষের আস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গর্বের জায়গা ওষুধশিল্পকে টেকসই করতে হলে বাজারের নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আস্থার সংকট তৈরি হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ প্রেসক্রিপশন কাগজে লেখা হয়।

কোন চিকিৎসক কত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন, কোন কোম্পানির ওষুধ বেশি দিচ্ছেন বা চিকিৎসা নির্দেশিকার বাইরে কতটা প্রেসক্রিপশন হচ্ছে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় কোনো তথ্যভাণ্ডার বা সফটওয়্যার নেই। ফলে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন।

২৬ শতাংশ খরচ শুধু ওষুধে : বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ খরচ হয় ওষুধে, আর ১৭ শতাংশ যায় রোগনির্ণয় পরীক্ষায়। একটি পরিবারের প্রতি মাসে গড়ে চিকিৎসাব্যয় তিন হাজার ৪৫৪ টাকা, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। বিআইডিএসের গবেষণা ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘অর্থের অভাবে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে চিকিৎসাই নিতে পারেন না।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি সংকট : দেশে ওষুধ উৎপাদন, বিপণন এবং মান নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তবে দেশের বিশাল ওষুধ বাজার এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় এই সংস্থার জনবল অত্যন্ত সীমিত। মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাব এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ধীরগতির কারণে মানহীন ওষুধ যেমন বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি ওষুধ কম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন কার্যক্রমের ওপর অধিদপ্তর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল ফোকাস থাকে শুধু ওষুধের লাইসেন্স প্রদান এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর। কিন্তু বাজারে আসার পর সেই ওষুধ কিভাবে চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, চিকিৎসকদের অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে কি না—এসবে নজরদারি নেই বললেই চলে।

বায়োমেডিক্যাল গবেষক এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. হুমায়রা ফেরদৌস বলেন, ওষুধ বাজারে আসার পর তার ব্যবহার, কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য অনিয়ম পর্যবেক্ষণের জন্য ‘পোস্ট মার্কেটিং মনিটরিং’ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, চিকিৎসক ও ওষুধ কম্পানির মধ্যে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) প্রেসক্রিপশনকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উচিত ওটিসি ওষুধের তালিকা নিয়মিত প্রকাশ, জেনেরিক নামসহ বাজারে থাকা ওষুধের তথ্য হালনাগাদ করা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ওষুধের বিজ্ঞাপন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। পুরো ব্যবস্থাকে রোগী ও ভোক্তাকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে পারলেই সেবার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

আইনের ফাঁকে ‘অদৃশ্য বাণিজ্য’ : দেশে ওষুধ খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ওষুধ আইন ২০২৩’ কার্যকর রয়েছে। এই আইনে ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের ওষুধ তৈরির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

১৯৪০ সালের পুরনো ড্রাগস অ্যাক্ট এবং পরবর্তী সময়ে হওয়া বিভিন্ন নীতিমালায় ওষুধের অনৈতিক প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। ‘কোড অফ ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস’ নামে একটি নীতিমালা দেশে রয়েছে, যা ওষুধ কম্পানিগুলোর প্রচারণার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসককে নগদ অর্থ, দামি উপহার বা ব্যক্তিগত সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না এলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। তা ছাড়া ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের মধ্যে ‘লেনদেন’-এর লিখিত প্রমাণ না থাকায় প্রচলিত আইনে এই অদৃশ্য বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন।’

ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং চিকিৎসকদের একাংশের অতিরিক্ত ওষুধ লেখার প্রবণতা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং ঔষধ প্রশামনের কাছে প্রায়ই মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিরল।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর’ প্রচণ্ড প্রভাব। দেশের ওষুধশিল্প এখন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক খাত। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৮ শতাংশ মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে ওষুধ খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোম্পানি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির প্রভাব রয়েছে।

অনেক সময় চিকিৎসকদের বড় বড় সংগঠন বা প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বার্ষিক সম্মেলন, সেমিনার, এমনকি ব্যক্তিগত বিনোদন সফরের সম্পূর্ণ খরচ বহন করে এই ওষুধ কোম্পানিগুলো। ফলে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অনৈতিক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে ভয়াবহ সংকট : প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। জ্বর, সর্দি, কাশিতেও চিকিৎসকরা দিচ্ছেন উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। ল্যাব রিপোর্ট ছাড়াই এসব ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আগামী দিনের বড় স্বাস্থ্যসংকট। বাংলাদেশে সেই সংকট ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।

ওষুধের চাপে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও  আর্থিক ক্ষতি : কোনো রোগীর একটি মূল রোগের জন্য তিনটির বেশি ওষুধ দেওয়া হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে অনেক সময় ‘অপ্রয়োজনীয় ওষুধ’ বা অযৌক্তিক প্রেসক্রিপশন বলা হয়। বাংলাদেশে একজন রোগীর গড় প্রেসক্রিপশনে ওষুধের সংখ্যা চার থেকে পাঁচটি, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে রোগীর শরীরে একাধিক ওষুধের পারস্পরিক বিক্রিয়া ঘটে। লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত ওষুধের চাপ পড়ে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি এর একটি বড় দিক হলো আর্থিক ক্ষতি। দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে নিম্নবিত্ত পরিবার ঋণের জালে জড়াচ্ছে।

প্রেসক্রিপশনের আড়াল থেকে বের হওয়ার উপায় : এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ওষুধশিল্পে স্বচ্ছতা এবং চিকিৎসায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করে বা শাস্তি দিয়ে এই সংকট দূর করা যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক নীতিগত সংস্কার ও প্রযুক্তির ব্যবহার।

আধুনিক নজরদারি জরুরি : কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দেশের ফার্মা কম্পানিগুলোর ওষুধ বিজ্ঞাপনে আইনি কড়াকড়ি থাকলেও বাজারে নিজেদের ওষুধ বেশি বেশি লেখানোর জন্য যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা এখন ওপেনসিক্রেট। এই প্রক্রিয়ায় বিক্রয় প্রতিনিধি এবং চিকিৎসকদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে। ওষুধ কম্পানি যখন কোনো চিকিৎসককে অনৈতিক সুবিধা ‘পে’ করে, তখন সেখানে সরাসরি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত চলে আসে। চিকিৎসকদের উপহার থেকে শুরু করে নগদ অর্থ দেওয়ার এই যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা থেকে সাধারণ রোগীদের রেহাই দিতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দরকার। আর এই কাজের মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, চিকিৎসা খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের পকেট ও জীবন রক্ষা করতে ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তির চাদরে ঢেকে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ ও শিক্ষা : বিশ্বের উন্নত দেশগুলো—এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কিছু রাজ্যেও ওষুধ বিপণন ও প্রেসক্রিপশন নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ‘ফিজিসিয়ান পেমেন্টস সানশাইন অ্যাক্ট’-এর মতো আইন রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কোনো ওষুধ কোম্পানি যদি কোনো চিকিৎসককে সামান্যতম কোনো উপহার, খাবারের খরচ বা গবেষণার জন্য অর্থ দেয়, তবে তা একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

নীতিগত সংস্কার : বাংলাদেশকেও এই পথে হাঁটতে হবে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের বাণিজ্যিক নাম লেখার পরিবর্তে জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি করা হলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর চিকিৎসকদের পেছনে টাকা ঢালার প্রবণতা এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ চিকিৎসক নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের প্রচার করতে পারবেন না।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ‘দেশের ওষুধশিল্পে টার্নওভারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অনৈতিক বিপণনে ব্যয় করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা বন্ধে ‘বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি’কেই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ই-প্রেসক্রিপশন ও সেন্ট্রাল ডেটা বেইস জরুরি : অনৈতিক চর্চা বন্ধে দেশের চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ ডিজিটাইজ করা জরুরি। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ‘ই-প্রেসক্রিপশন’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

চিকিৎসক যখন একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন তৈরি করবেন, তখন সেটি একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা থাকবে। কোনো চিকিৎসক যদি নির্দিষ্ট কোনো রোগের জন্য আন্তর্জাতিক গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক লেখেন, তবে সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘অ্যালার্ট’ দেবে। এতে চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

উপহারের তথ্য প্রকাশ করতে হবে : আইন করে চিকিৎসকদের জন্য ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া যেকোনো আর্থিক সুবিধা, স্পনসরশিপ বা উপহারের তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে রোগীকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। চিকিৎসকদেরও রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে ওষুধের কার্যকারিতা বুঝিয়ে বলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।

সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই : বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধশিল্প ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে এখনই কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। প্রেসক্রিপশন নজরদারি, ই-প্রেসক্রিপশন চালু, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নীতি, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আকতার হোসেন বলেন, ‘দেশের ওষুধ খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও অনৈতিক চর্চা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে আমাদের কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতা চলমান রয়েছে। ওয়ান স্টপ মনিটরিং নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে একটি করে শক্তিশালী ‘অ্যাকশন কমিটি’ কাজ করছে।’

তিনি বলেন, ওষুধ খাতের এই মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করতে আমরা বদ্ধপরিকর। কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ আমাদের কাছে এলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘একজন রোগীর চিকিৎসাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং একটি অত্যন্ত গোপনীয় নথি। রোগী নিজে না চাইলে বা অনুমতি না দিলে এই তথ্য অন্য কারো দেখার কিংবা জানার আইনগত অধিকার নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের আইন লঙ্ঘন ও রোগীদের হয়রানি করা হচ্ছে, তবে সেই হাসপাতালের বিরুদ্ধেও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’ (শেষ) সৌজন্যে কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম