নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ এপ্রিল, ২০২৬, 10:53 AM
নকল পণ্যে খোয়া যাচ্ছে তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব
নকল পণ্যের প্রসারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বিপুল পরিমাণে কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো
দেশের সর্বত্রই নকল ও ভেজাল পণ্যের আধিপত্য। বর্তমানে দেশের বাজারের ৪০ শতাংশই নকল ও ভেজাল পণ্যের দখলে। খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য ও প্রসাধনী থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যেই ছড়িয়ে গেছে এই বিষ। এতে হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।
বৈধ কোম্পানির নামে নকল পণ্য বিক্রি হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এতে সরকারের কোষাগার হারাচ্ছে তিন হাজার ১৭০ কোটি টাকা রাজস্ব। বৈধ ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমছে ১৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন রোগের কারণে জিডিপিতে ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন ভোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই অঙ্ক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। মূলত বিভিন্ন খাতে এমন রাজস্ববিহীন কেনাকাটা বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে না পারায় এই ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। এতে উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি, গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখতে পারছে না সরকার।
একই সঙ্গে অবৈধ ব্যবসার প্রসারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে সরকারকে বিপুল পরিমাণে কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে উত্থান ঘটছে কালোবাজারিদের। বৈধ কোম্পানির পণ্যের মধ্যে নকল পণ্যের ছড়াছড়ি, অনেক সময় বোঝার উপায় থাকে না কোনটা আসল, কোনটা নকল। ফলে অনেক সময় বৈধ কোম্পানিগুলো হুমকির মুখে পড়ে, যার ফলে সরকারের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি।
বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র বলছে, দেশের স্থানীয় বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করেছে নকল ও ভেজাল পণ্য। ওষুধ, খাদ্য ও পানীয়, মসলা, দুগ্ধজাত পণ্য, সিগারেট, প্রসাধনী, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্পসহ এমন কোনো পণ্য বাকি নেই, যা নকল হচ্ছে না।
ভেজাল পণ্যের তালিকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দুধ, তেল, মধু, কফি, চা, সস, চকোলেট, বোতলজাত পানি, কোমল পানীয় ও শিশুখাদ্য। বৈধ কোম্পানির চা, কফি, দুধ চকোলেটসহ বৈধ পণ্যগুলোর নাম একটু এদিক-সেদিক করে বাজারজাত করাই হলো অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট। জানা গেছে, সহজ উৎপাদনপ্রক্রিয়া, তুলনামূলক কম দাম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই বাণিজ্যের প্রসারের মূল কারণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ (বিবিএস) বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ৮০-৯০ শতাংশ পরিবার দুধ, চা, কফি ও শিশুখাদ্য প্রতিদিন গ্রহণ করে। লাখো শিশু সম্পূর্ণভাবে শিশুখাদ্য দুধের ওপর নির্ভরশীল। এসব বহুল ব্যবহৃত পণ্য নকল হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি হচ্ছে। নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া, সংক্রমণ ও কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লিভার ও হজমজনিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা বৈধ কোম্পানির ট্রেডমার্ক, প্যাকেজিং ও রং প্রায় হুবহু নকল করায় ভোক্তারা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে বড় বৈধ কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড সুনাম ও আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা, ভেজাল ও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বৈধ উৎপাদকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন জোরদার হবে, তেমনি রাজস্ব আহরণ ও বৈধ ব্যবসার পরিবেশও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশে কয়েকটি সংস্থা মাঝে মাঝেই ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। তাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এর পরও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়নি। বরং দিনের পর দিন সংকট আরো বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জনবলসংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ও তদারকির দুর্বলতায় এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।
দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, পণ্যের সহজ যাচাইয়ের জন্য কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু এবং নকলকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে আইনের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএসটিআইয়ের ভুয়া সিল ও বৈধ পণ্যের নাম নকল করে চা, কফি, ভোজ্যতেল, গুঁড়া দুধ, বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, প্রসাধনী, ওষুধ, সিগারেট ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বিক্রি রমরমা। এসব পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের অনুমোদনহীন কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কম দামের প্রলোভন ও বিভ্রান্তিকর প্যাকেজিং করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জাল বিএসটিআই স্টিকার ও হলোগ্রাম তৈরি হচ্ছে। ফলে নকল পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভোক্তারা নকল পণ্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকে কম দামের খপ্পরে জেনেবুঝেই নকল পণ্য কিনছেন। আবার অনেকে প্যাকেজিংয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। দেখে বোঝার উপায় থাকে না কোনটা বৈধ আর কোনটা নকল। বৈধভাবে পণ্য উৎপাদনে উচ্চ শুল্ক, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। আর এই সুযোগেই দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ছে নকল পণ্য।
জানা গেছে, নকল খাদ্যপণ্য ও পানীয়তে ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও নিম্নমানের উপাদান থাকে। এতে খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে। নকল প্রসাধনীতে পারদ, স্টেরয়েড ও সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান ত্বকের অ্যালার্জি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যহানি তৈরি করে।
বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তাতে সফলতা নেই। বরং বিএসটিআইয়ের তথাকথিত অভিযানের পরও নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত অব্যাহত থাকে। এখানে বিএসটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ ও অনুমোদনের সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগসাজশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, বর্তমান আইনে জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সতর্কবার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে হয়। লাইসেন্স প্রদান ও তদারকি কার্যক্রমের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এক সংস্থা লাইসেন্স দিলেও অন্য সংস্থা তদারকি করে, ফলে সামগ্রিকভাবে মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সমন্বয়হীনতার কারণেই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। মারা যায় প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ। দেশে ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকল পণ্য ব্যবহারে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তাঁরা ঘরে তৈরি নিরাপদ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েছেন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৫৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং শতাধিক মামলাও করা হয়েছে। তার পরও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন