তৃনমূল বিএনপি বিএনপির ব্যর্থতা।
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 9:26 PM
NL24 News
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 9:26 PM
তৃনমূল বিএনপি বিএনপির ব্যর্থতা।
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর নেতৃত্ব নিয়ে এখন টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। তাঁরা দীর্ঘদিন যাবৎ নেতৃত্ব সংকটে ভুগছেন। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্দেশনাহীন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের যোগ্যতা, সততা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তারেক রহমানের সীমাহীন দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং একের পর এক অপকর্মের ফলে একজন নেতা হিসেবে তারেকের যে জাতীয় ইমেজ, সেটা বিতর্কিত হতে থাকে। এছাড়া তারেক দল-মতের ঊর্ধ্বে যাওয়ার ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেন। অন্যদিকে তারেক জিয়া শুধু তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া বিএনপির ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বিএনপিকে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই মনে করেন তারেক। এটা তার অর্থ উপাজর্নের একটি সংগঠন হিসেবেই বিবেচনা করেন বলে মনে করেন বিএনপির একাধিক নেতা। তারেকের নির্দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে টানা অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকা-ে বিএনপির কোনো নেতা অস্বীকৃতি জানালে বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাঁদেরকে তারেক রহমান দল থেকে বহিষ্কার করেছেন। এছাড়াও বিএনপি দলকে ব্যবহার করে তারেক রহমানের অপকর্মের কারণে অনেক সিনিয়র নেতা বিভিন্ন সময়ে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। যোগ্য নেতৃত্ব সংকটে এবং জনগণের সমর্থন হারিয়ে ব্যর্থ বিএনপি সংগঠন থেকে বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত এবং পদত্যাগকৃত নেতাদের সমন্বয়ে বিএনপির সাবেক নেতা প্রয়াত নাজমুল হুদার একান্ত প্রচেষ্টার ফলে গড়ে ওঠে তৃণমূল বিএনপি নামে নতুন রাজনৈতিক সংগঠনটি।
এই তৃণমূল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সাধারণত যা তৃণমূল বিএনপি নামে সর্বাধিক পরিচিত- বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যা ২০১৫ সালে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দলটি হুদা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) দ্বারা নিবন্ধিত তাঁর দ্বিতীয় দল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ছাড়ার পর হুদা প্রথমে বিএনএফ প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও পরে তাকে বিএনএফ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফলে উদ্ভব তৃণমূল বিএনপিকে বিএনপি এবং অন্য কিছু পর্যবেক্ষকরা ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক গোপন কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা বলে মনে করে দাবি করেন যে যদি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে তবে নাগরিকদের এটিকে 'বিকল্প বিএনপি' হিসেবে দেখানোর যাবে এমন। এই ধরনের খুঁড়া যুক্তি ও অভিযোগ বিএনপির রাজনৈতিক অপরিপক্কতারই ইঙ্গিত বহন করে। অথচ তৃণমূল বিএনপি অতীতে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোটে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেও তা পারেনি। ক্ষমতাসীন সরকারের কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতায় নয় বরং বিএনপি দলের ব্যর্থতার ফসল আজকের এই তৃণমূল বিএনপি।
এই তৃণমূল বিএনপি দলটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এই দলের প্রতিষ্ঠিতা প্রয়াত নাজমুল হুদার মেয়ে অ্যাডভোকেট অন্তরা হুদা নির্বাচিত হয়েছেন এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন। পর্যায়ক্রমে বিএনপি থেকে বিভিন্ন সময় বাদ পড়া এবং নিজ থেকে ছেড়ে দেওয়া নেতারাও যোগ দিচ্ছেন এই দলে। বিএনপির সাবেক নেতা প্রয়াত নাজমুল হুদা প্রতিষ্ঠিত এই দলটি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিল করেছে গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩(মঙ্গলবার)। কাউন্সিলে বিএনপির সাবেক, বহিষ্কৃত ও নিষ্ক্রিয় একঝাঁক নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত ও আলোচিত মুখ শমসের মবিন চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার রয়েছেন। শমসের মুবিন চৌধুরীকে দলের চেয়ারম্যান আর তৈমুর আলম খন্দকারকে দলের মহাসচিব করা হয়েছে। এ তালিকায় বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ-সদস্য উকিল আবদুস সাত্তারও আছেন।
বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শমসের মুবিন চৌধুরী জানিয়েছিলেন যে 'সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্নে' মতবিরোধের কারণে বিএনপি থেকে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ্য করেছিলেন যে কারণে বিএনপি ছেড়ে এসেছিলেন সেই কারণ তো বিএনপিতে এখনো এখনো রয়েছে মানে বিএনপি দলে এখনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিদ্যমান রয়েছে। এ করাণে বিএনপিতে ফিরে যাওয়ার তাঁর কোনো ধরনের আগ্রহ নেই। তাই সে বিএনপিকে চিরতরে ছেড়ে তৃণমূল বিনপিতে যোগ দিয়েছেন। এই তৃণমূল বিএনপি দলের নীতি, আদর্শসহ অনেক কিছু রয়েছে যা তার পছন্দ হয়েছে। এছাড়া তার চিন্তাধারা নিয়েও দলটি তার সাথে একমত হয়েছেন। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংকটে ভোগা ব্যর্থ বিএনপির বদলে তৃণমূল বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন বিএনপির প্রবীণ এই নেতা। তাঁর মতে বিএনপি রাজনৈতিক আদর্শ বিচ্যূত একটি হটকারী রাজনীতির পথ গ্রহণ করেছে। এ কারণেই সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যে এই তৃণমূল বিএনপি নামজ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছেন।
১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তৈমুর আলম খন্দকার। মানবসেবা এবং মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে বিএনপি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। ৭০ বছরের ভেতরে ও বাইরে বিএনপির অধিকাংশ নেতা যেকোনো অবস্থায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেতে চান। কারণ জীবন সায়াহ্নে এসে তারা সংসদ সদস্য এ পরিচয় নিয়ে মরতে চান। সুতরাং আসন্ন নির্বাচন তাদের অনেকে এমপি হওয়ার আশা করছে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না গেলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হবে বলে মনে করছে। মূলত এ অংশটিই তৃণমূল বিএনপির কারিগর।
তৃণমূল বিএনপি নিয়ে আওয়ামী লীগ ভাবছে না। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নতির প্রমাণ এটি। বিএনপির নেতৃত্বে অনীহা ও আস্থা না থাকায় তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বিএনপির নেতারাই। দুর্নীতিবাজ দন্ডপ্রাপ্ত নেতার নেতৃত্বে কাজ করতে চান না বিএনপিতে এমন নেতার সংখ্যা অনেক। তাদেরই ঠিকানা এই তৃণমূল বিএনপি রাজনৈতিক সংগঠনটি।
ইতিমধ্যে তৃণমূল বিএনপি নেতা অন্তরা হুদা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দল ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেই তাদের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এই নির্বাচনে যেন জনপ্রিয় এবং ভালো প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে সেই জন্যই জাতীয় নির্বাহী কমিটিকে পুনর্গঠন করা হলো। এর মাধ্যমে অন্যান্য বিএনপি নেতা যারা নির্বাচন করতে চান এবং এলাকায় যাদের জনপ্রিয়তা আছে তাদের প্রবেশগম্যতার সুযোগ করে দেওয়া হলো। তারা তৃণমূলে যোগ দিলে এই দলটি আরও শক্তিশালী হবে। তবে তৃণমূল বিএনপি সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে নয় বরং জাতীয়তাবাদী চেতনার সত্যিকারের রাজনৈতিক দল হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে বলে ওই তৃণমূল বিএনপি দলের নেতারা বলেছেন।
বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে তৃণমূল বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তৃণমূল বিএনপিতে আরও চমক আসছে। শুধুমাত্র বিএনপি থেকে যারা বাতিল হয়েছেন, বিএনপিতে যারা পদচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত হয়েছেন তারাই নয় বরং বিএনপির মধ্যে এখন সক্রিয় রয়েছে এরকম অনেক নেতা রাজনৈতিক আদর্শহীন এবং যোগ্য নেতৃত্বহীন বিএনপি ছেড়ে এই তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিতে পারে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময় সাপেক্ষের ব্যাপার এবং বিএনপির নির্বাচন করা না করার ওপর তৃণমূল বিএনপির আকৃতি এবং বিস্তার অনেকখানি নির্ভর করছে। যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ বিএনপি অনেক নেতাকর্মী তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাওয়ার মাধ্যমে এই তৃণমূল বিএনপিতে বড় ধরনের চমক আসবে। কারণ বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাই তৃণমূল যোগ দিতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন। এমনকি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এখন যারা রাজপথে আন্দোলনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় এরকম বেশ কিছু নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে তৃণমূল বিএনপির পক্ষ থেকে। তৃণমূলের যে দুজন নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন অংশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন অনেকেই হয়তো সামনে এই তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসবে। আর এর মাধ্যমে রাজনৈতিক আদর্শ বহির্ভূত এবং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিশ্বে পরিচিত বিএনপি দল সামনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে।
সুতরাং রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুন নিবন্ধন পাওয়া তৃণমূল বিএনপি মূলত রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ বিএনপি থেকে বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত এবং পদত্যাগকৃত নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠেছে এবং বিএনপির অনেক সক্রিয় নেতা আছে যারা বর্তমান নেতৃত্ব সংকটে ভোগা বিএনপিকে ছেড়ে ভবিষ্যতে এই তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিবে। আর এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপির বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠবে এই তৃণমূল বিএনপি এবং অস্তিত্ব হারাবে বিএনপি নামক এই সন্ত্রাসী সংগঠনটি। তারমানে বিএনপির ব্যর্থতার ফসল এই তৃণমূল বিএনপি অদূর ভবিষ্যতে বিএনপির অস্তিত্ব বিলীন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নিবে বলে প্রত্যাশা করছি।
ট্রেজারার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়