এক গোল ও দুই অ্যাসিস্টে বিদায়ী ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলেন মেসি
স্পোর্টস ডেস্ক
০৭ অক্টোবর, ২০২৬, 11:50 AM
স্পোর্টস ডেস্ক
০৭ অক্টোবর, ২০২৬, 11:50 AM
এক গোল ও দুই অ্যাসিস্টে বিদায়ী ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলেন মেসি
বেনিনকে ৩-০ গোলে হারাল আর্জেন্টিনা
২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর মঙ্গলবার পর্দা নামালেন লিওনেল মেসি। বুয়েনস এইরেসে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নেমে আবেগঘন বিদায় নিলেন বিশ্বজয়ী এই দলের কোটি সমর্থকের কাছ থেকে।
অনবদ্য এক সমাপ্তিতে ৩৯ বছর বয়সী মেসি ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে করলেন নিজের ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল। তার নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে হারিয়েছে বেনিনকে। ম্যাচে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করে ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন মেসি। পাশাপাশি ম্যাচের অন্য দুটি গোলেও সহায়তা করেছেন তিনি। অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি প্রথম গোলটি করেন। পরে গোলের তালিকায় নাম লেখান নিকো পাজও।
তবে ম্যাচের ফলাফল এ দিনের আবেগঘন আয়োজনের কাছে ছিল অনেকটাই গৌণ। ‘শেষ ট্যাঙ্গো’ নামে যে বিদায়ের আয়োজন ঘিরে এতদিন অপেক্ষা, সেই রাতে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের দর্শকদের ভালোবাসা শেষবারের মতো উপভোগ করেছেন মেসি।
মাঠে নামার আগেই আবেগ সামলাতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মেসি ও তার সতীর্থদের বহনকারী বাসটি যখন শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় পেরিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিল, তখন চোখের পানি মুছতে দেখা যায় তাকে।
তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। ভিআইপি গ্যালারি থেকে স্নেহভরা হাত নেড়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি।
খেলা শুরুর কিছুক্ষণ আগে মাঠে মেলে ধরা হয় বিশাল আর্জেন্টিনার জার্সি। সেখানে মেসির ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ‘ধন্যবাদ’। গ্যালারির দর্শকেরা তখন করতালিতে মুখর করে তোলেন পুরো স্টেডিয়াম।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের সাবেক সেনা ফাবিও সান্তানা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করার সময়ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি। তার পাশে ছিল একটি ব্যানার, যেখানে লেখা ছিল ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরাও একই ব্যানার তুলে ধরেছিলেন।
ম্যাচের দশম মিনিটে থামানো হয় খেলা। মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট ধরে করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মনুমেন্তাল। বার্সেলোনা ও প্যারিস সাঁ-জার্মাঁর সাবেক তারকাকে এভাবেই শেষবারের মতো সম্মান জানান সমর্থকেরা।
এরপর ৭১তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিদায়ের রাতটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলেন মেসি।
শেষ বাঁশির পর স্টেডিয়ামের আকাশে শুরু হয় বিশেষ আলোক প্রদর্শনী। আকাশে ভেসে ওঠে মেসির ছবি। আটবারের ব্যালন দ’অরজয়ী এই তারকাকে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির বিদায় এসেছে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের আড়াই মাস পর। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে উত্তেজনাপূর্ণ একতরফা লড়াইয়ে ১-০ গোলে হেরে চোখের পানিতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিকে।
সেই সময় মেসি লিখেছিলেন, ‘আমি সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার বাকি নেই। পাশাপাশি দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা নিজেদের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।’
মঙ্গলবারের ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয় মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়।
পড়াশোনা আরও বেশি করা উচিত ছিল বলে অতীতে আক্ষেপ প্রকাশ করা মেসি এ সম্মানে গর্বিত বলে জানান। মজা করে তিনি বলেন, ‘আমি যে এখন সম্মানসূচক ডাক্তার বলতে পারি!’
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরের বাইরে সমর্থকেরা মেসির ছবি সংবলিত বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকা মেলে ধরেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমার জীবনের আনন্দ।’
বিদায়ী এই চ্যাম্পিয়নকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মেসির সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ নেইমারও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলের জন্য তুমি যা করেছ, তার জন্য পুরো বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায়। ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’
ইন্টার মায়ামির সঙ্গে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে মেসির। তবে দুই মাস আগে বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ধারণার চেয়েও আগেই হয়তো বুটজোড়া তুলে রাখতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির বিদায় এসেছে তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের চার বছর পর। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথ দেখিয়ে নিজেকে দিয়েগো মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করেন।
মেসির বিদায় নিয়ে ৫২ বছর বয়সী সমর্থক সেসিলিয়া আদ্রিয়ানো বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, মেসি সবকিছু দিয়েছে, একেবারে সবকিছু। তাই তার বিদায়ে আমার একটুও খারাপ লাগছে না। সে এর চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করেছে। এবার তাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে দিন, বিশ্রাম নিতে দিন।’
আর্জেন্টিনার হয়ে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি জিতেছেন একটি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে দুবার রানার্সআপ হয়েছে আর্জেন্টিনা—২০১৪ সালে ব্রাজিল এবং ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকায়। এ ছাড়া ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতেছে তার দল।
মেসির বিদায়ের রাত তাই শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়; আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়েরও পর্দা নামল এদিন।