ঢাকা ০২ মে, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
মহান মে দিবস আজ : শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও ২ শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেফতার করা প্রয়োজন: নাহিদ ইসলাম প্রথমবারের মতো নারী পুলিশ সুপার পাচ্ছে ঢাকা জেলা কবে শতভাগ শিশু হামের টিকার আওতায় আসছে জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘বিএনপির সময়ে শেয়ারবাজার লুটপাটের সুযোগ ছিল না, এবারও থাকবে না’ অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১২ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই দুই বিল পাশ ২৩৮৬৫টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, সংসদে আইনমন্ত্রী ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার: প্রধানমন্ত্রী

একাত্তরের রাজাকার পুত্ররা ২০২৩ সালে গণতন্ত্রী

#

২৭ আগস্ট, ২০২৩,  3:52 PM

news image

-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-

বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেওয়া অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মতো গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথচলা কিন্তু এতটা মসৃণ ছিলোনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৌশলী এবং যাদুকরী নেতৃত্বের ফলে রাজাকারদের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে মাত্র ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের স্বাধীন হয় আমাদের বাংলাদেশ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু আত্মত্যাগ বিশ্বে প্রশংসনীয়। বঙ্গবন্ধু সকলের সমঅধিকার নিশ্চিত করে একটি গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত লড়ে গিয়েছেন। কিন্তু ৭৫-এ নির্মম ঘাতকদের বুলেটে স্তব্ধ হয়ে যায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ও পথচলা। ৭১ এর রাজাকারেরা ৭৫-এ নির্মমভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারকে। সাথে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নকে। এই রাজাকারেরা ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং পরে তারা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ব্যাহত করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আল বদরেরা ১৯৭১ সালে যে ব্যাপক ও নির্মম গণহত্যা ঘটায়, তাতে ৩০ লাখ বাঙালির জীবন নির্বাপিত হয়। প্রায় চার লাখ বাঙালি নারী ধর্ষিত হন এবং তাদের নিষ্ঠুরতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে এক কোটি মানুষ ভারতের মাটিতে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি জনসাধারণের উপর তাঁদের নির্যাতনের ইতিহাস মানবতার চরম অবনতিই নির্দেশ করে। 

কিন্তু অত্যন্ত অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে যে ৭১ এ রাজাকার পুত্ররা ২০২৩ সালে এখন গণতন্ত্রী। গণতন্ত্রের মায়াকান্নায় তাঁরা দেশ কাঁপাচ্ছে। স্বাধীনতার পূর্ব এবং পরে সবসময় গণতন্ত্রে বিরোধিতাই ছিলো যাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাদের মুখে আজকাল গণতন্ত্রের বাণী শোনা যাচ্ছে। অথচ এই রাজাকার পুত্ররা গণতন্ত্রের নূন্যতম জ্ঞান ও ধারণাই রাখেনা। এরা পাকিস্তানের দোসর এবং স্বাধীনতার পূর্ব থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার লক্ষ্যেই তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এই রাজাকারদের প্রথম প্রচেষ্টা ছিলো ১৯৭১ এ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনে বাঁধা প্রদান। তাতে ব্যর্থ হয়ে পরে দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথচলা। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটানো রাজাকার পুত্ররা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশকে একটি অগণতান্ত্রিক, অমানবিক এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। অন্যায় এবং অত্যাচরের এমন কোন দিক ছিলোনা যে তাদের পদচারণা হয়নি।

১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এই রাজাকার পুত্রদের অপশাসনের ফলে বাংলাদেশ একটি দূর্নীতি, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, চুরি, সন্ত্রাসী এবং ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিলো। রাজাকার পুত্রদের শাসনামলে বাংলাদেশের উন্নয়নের চেহারা ছিল বর্তমান সময়ের উন্নয়ন অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিলো অনেক কম, বেকারত্বের হার ছিলো অনেক বেশি, ছিনতাই, লুটপাট, রাহাজানি, মারামারি, সন্ত্রাসী, দূর্নীতি, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি ছিলো নিত্য নৈমেত্তিক বিষয়। জনজীবনে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা ছিলোনা। বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিলো অনেক কম, বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস সংকট এসব ছিলো প্রতিদিনের সমস্যা। সেই সময়ের বাংলাদেশের দূরাবস্থাই প্রমাণ করছে যে গণতন্ত্রের গান গাওয়া রাজাকার পুত্ররা দেশ এবং দেশের মানুষের উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের ক্ষতিই করেছে এবং এখনও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে জ্বালাও পোড়াও করে দেশকে ধ্বংসের  দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে। তাদের অপশাসনের ফলে বাংলাদেশ পরপর পাঁচবার দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

১৯৭১ এই রাজাকারেরা ধর্মকে পুঁজি করে বাংলাদেশের বিরোধিতা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোলাম করে রাখার চেষ্টা করেছিলো এবং ২০২৩ সালে এসে রাজাকার পুত্ররা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে রুখে দিয়ে তাকে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে পরিণত করতে চাচ্ছে। এই রাজাকার পুত্ররা ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত কখনো বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের মানুষের ভালো চায়নি খারাপ ছাড়া। সুতরাং এরা গণতন্ত্র বলে যতই লাফালাফি করুক তাদের হাতে গণতন্ত্র হরণ ছাড়া গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়নি। অতীতেও আমরা দেখেছি ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজাকার পুত্রদের দেশব্যাপী হরতাল অবরোধের ধারাবাহিকতায় আগুন সন্ত্রাসের অবর্ণনীয় কার্যক্রম। এর ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল দেশের আপামর জনসাধারণ। শিশু ও নারীরাও তাদের এ ভয়াবহ কর্মকান্ড থেকে রক্ষা পায়নি। মানুষের মনে আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, একটি অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল জনগণ। জনগণ কখনোই ঐ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাইবে না। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে যে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, অসংখ্য মানুষ জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির শিকার হয়ে নিহত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হাজার হাজার মানুষ, বিনষ্ট হয়েছে অজস্র সম্পদ। এর দায় রাজাকার পুত্ররা স্বীকার না করলেও তাদের উপরেই বর্তায়, কেননা নির্বাচনকে বাঁধাগ্রস্থ করতেই তাঁরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এর ফলে রাজনীতিতে যেখানে অন্যরা প্রতিনিয়ত বিচক্ষণ ও কৌশলী হয়ে উঠে সেখানে তাঁরা নিজেরা এসব সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ফলে নিজেদের উপর অভিযোগ দাখিলের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ইস্যু রাজনীতিতে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটালে রাজাকার পুত্রদের নিঃসন্দেহে জনগণ থেকে পালাক্রমে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাস বলে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা মানেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উন্নয়ন একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাজাকার পুত্রদের স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাঙালির ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরের নরঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন এবং রায় কার্যকর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব, যোগ্যতা, নিষ্ঠা, মেধা-মনন, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এক সময় দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষে জর্জরিত যে বাংলাদেশ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করত সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বজয়ের নবতর অভিযাত্রায় এগিয়ে চলছে। বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং গণতন্ত্র বিকাশে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অবদান অপরিসীম ও অতুলনীয়া। তাঁর দূরদৃষ্টি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কমেছে দারিদ্র্যের হার। তাঁর সাহসিকতা এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেছে। বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত করতে তিনি ‘ভিশন ২০২১’ ও ‘ভিশন ২০৪১’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও এর বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে শেখ হাসিনার এসব যুগান্তকারী কর্মসূচি বাংলার ইতিহাস হয়ে থাকবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের এমন কোনো দিক নেই যেখানে বাংলাদেশের পদচারণা হয়নি।

সুতরাং তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বাঙালি জনসাধারণ এখন যথেষ্ট সচেতন। বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার চেতনাকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প-সংস্কৃতি, গবেষণা ইত্যাদির উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রতিনিয়ত বাঙালি জনসাধারণকে উন্নত এবং সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার সুযোগ করে দিয়েছেন। সুতরাং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার বিকল্প আর কেউ হতে পারেনা। শিক্ষিত এবং সচেতন বাঙালিররা এখন বুঝতে পেরেছে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে এই রাজাকার পুত্রদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আসলে কী! তাঁরা যতই গণতন্ত্রের দোহাই দিক না কেন এগুলো মূলত বাংলাদেশে তাঁদের পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপপ্রচেষ্টা মাত্র। এখনি উপযুক্ত সময় মহান মুক্তিযুদ্ধের শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের মহান শক্তিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে শক্ত হস্তে এই রাজাকার পুত্রদের প্রতিহত করার। শহীদদের রক্তে অর্জন এই স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো ধরনের রাজাকারের ঠাঁই হতে পারেনা।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
ট্রেজারার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক চেয়ারম্যান
ট্যুরিজম অ্যান্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম