ইইউ’তে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কেন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 2:30 PM
NL24 News
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, 2:30 PM
ইইউ’তে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কেন
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন এক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা এবং সুবিচার নিশ্চিত হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সংবিধানে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সব নাগরিকের আইনের আশ্রয় পাওয়ার সমানাধিকার নিশ্চিত করেন। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর দেশে আইনের শাসন ও মৌলিক মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়। '৭৫ পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামাত জোট সরকার হত্যা, ক্যু, নির্যাতন ও নিপীড়নের রাজত্ব কায়েম করে সুবিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে দেশের জনগণ আইনগত সহায়তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
বর্তমানে বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৪ বছরের অধিক শাসনামলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে আইনগত সহায়তা প্রদানের জন্য সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০' প্রণয়ন করেছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ ছাড়াও এসিডদগ্ধ নারী-পুরুষ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা, বিনা বিচারে আটক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, পাচারকৃত নারী বা শিশুদের সম্পূর্ণ সরকারি অর্থ ব্যয়ে আইনগত সহায়তা প্রদান করার মাধ্যমে সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে এখন শুধু আইনি সহায়তা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং মামলাজট কমানোর লক্ষ্যে এসব অফিসকে ‘এডিআর কর্নার' বা 'বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্র স্থল' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের জনগণকে বিনা খরচে সরকারি আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যা সারাদেশের আদালতসমূহে মামলাজট হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভয়ভীতি ও বৈষম্য দূর করে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি'র অন্যতম লক্ষ্য ‘ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার' অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করতে সক্ষম হওয়ার আশায় ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ‘রূপকল্প ২০৪১' বাস্তবায়নে সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের একান্ত প্রচেষ্টায় মানবাধিকার ও শান্তির ক্রমোন্নতির সূচকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বিস্ময়কর। বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র বিশ্বের শরণার্থী, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় বিশ্বদরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন। এ ছিল মানবাধিকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় দেশের সরকারি জনবল ব্যবহার হচ্ছে, সার্বিক পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের সুযোগ-সুবিধা হারাচ্ছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য মানবিক সাহায্যে খরচ করছে। সরকার তার বাজেটের একটি অংশ রোহিঙ্গাদের মানবিক কল্যাণে খরচ করছে।
যদিও তাদের মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অর্থ প্রদান করছে, তারপরও সরকার নিজস্ব তহবিল থেকেও ব্যয়নির্বাহ করছে। সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য অব্যাহত রেখেছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ সরকার আশ্রয় ও মানবিক সাহায্য-সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রয়োজীয় মানবিক সাহায্য সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের কার্যালয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থা এসব কার্যক্রমে সমন্বয় করে। রোহিঙ্গা শিবির ক্যাম্পে আশ্রয়প্রার্থী এতিম শিশুর সংখ্যা চল্লিশ হাজারের অধিক। এদের প্রায় নয় হাজার শিশুর মা-বাবা কেউ নেই। এসব এতিম শিশুদের তত্ত্বাবধান ও সুরক্ষার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যেগে এতিম শিশুদের লালন-পালনকারী পরিবারকে নগদ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় এক লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে অস্থায়ী ভিত্তিতে আবাসন ব্যবস্থা করে দিয়েছে ভাসানচরে। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চরইশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরের এ প্রকল্পে রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আবাসন, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের পাশাপাশি থাকছে জীবিকা নির্বাহের সুবিধাসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। প্রায় তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গার জীবন-জীবিকার জন্য তৈরি করা হয়েছে ভাসানচর আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন নোয়াখালী বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা গ্রামে ভূমিহীন-গৃহহীন, অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের একান্ত প্রচেষ্টার ফলে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকে চার ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৩। এ বছর ১৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ১২৯তম অবস্থানে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারের কাজ করে যাচ্ছে।
কিন্তু মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যেখানে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ প্রশংসিত সেখানে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবে মিথ্যাচার করে বলা হয়েছে যে, বিচার বহির্ভূত হত্যা, বলপূর্বক নিখোঁজ বা গুম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করাসহ বাংলাদেশে নানাভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে প্রশংসনীয় বাংলাদেশকে নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এমন প্রস্তাব নিন্দাজনক। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির লবিং অপরাজনীতির ফসল এসব প্রস্তাব। বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য ও উন্নয়নকে পাশ কাটাতে নানামুখী অপপ্রচার করা হচ্ছে। এই সব অপপ্রচারের ইন্ধনদাতা ৭১ এর পরাজিত শক্তি।
যারা বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা যদি একটু লক্ষ্য করেন তাহলে বুঝতে পারবেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিতর্কের খসড়া প্রস্তাব এবং ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগগুলো প্রায় একই। তাহলে একটি প্রশ্ন এসেই যায়, তবে কি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোন পক্ষকে সুবিধা দিতে এই বিতর্কের আয়োজন করেছে? বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি এই বিতর্কে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেলে অবাক হওয়ার কিছু দেখছি না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছেন খুবই ভাল প্রস্তাব, বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক।সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট এবং দলের সঙ্গে দফায় দফায় সংলাপ করেছে। নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনের তপসিল ঘোষণা করেছে এবং ঐক্যফ্রন্টের দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়েছে। বিরোধী জোটের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে। বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হাজার হাজার নেতাকর্মী দলীয় মনোনয়ন ফর্ম সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অনেকটাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে এবং সব মহলেই শেখ হাসিনা প্রশংসিত হচ্ছেন। সবকিছু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচনের উৎসব বিরাজ করছে। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করছি এই বলে যে, শেখ হাসিনা তার দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বাংলাদেশে একটি মডেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং আপনারাও পর্যবেক্ষক হিসাবে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সরকার, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও ‘৭৫ এর ঘাতকদের সমর্থক বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে জঙ্গিবাদের উত্থানকে কঠোর হস্তে দমন করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত জনগণের সম্বন্বিত প্রচেষ্টায় এবং দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তায় আজ সাময়িক নিষ্ক্রিয় হলেও তারা গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই পেতাত্মারা লবিং করে তাঁদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউ-তে মিত্যাচার করছে। কোনো ধরনের তদন্ত ও যাচাই-বাছাই ছাড়া বাংলাদেশকে নিয়ে এমন মিথ্যাচার কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহনযোগ্য নয়। এই মিথ্যাচার দেশকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শামিল।
এমতাবস্থায়, যেকোন মূল্যে এই ষড়যন্ত্র কে নস্যাৎ ও নির্মূল এবং অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা। এটাই এখন দেশপ্রেমিক নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা ও সময়ের দাবি। পাশাপাশি ইউ সংগঠনটির উচিত সকল প্রকার মিথ্যাচার ও লবিং রাজনীতি বাদ দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অখ-তা রক্ষা করে তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সহায়তা করা। এতেই সুন্দর হবে এই পৃথিবী এবং সুন্দর হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে প্রশংসনীয় বাংলাদেশ।